ত্রিপুরার ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্রে ৩৪ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ঘোষণা; মুখ্যমন্ত্রী সাহা EAP বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানালেন

ত্রিপুরা রাজ্যের পর্যটন এবং অর্থনৈতিক পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মানিক সাহা বড়সড় ঘোষণা করলেন। আগরতলায় এক সরকারি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী এবং ইতিহাসবাহী স্থানগুলির উন্নয়নের জন্য মোট ৩৪ কোটি টাকার নতুন পর্যটন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে Externally Aided Projects (EAP)-এর সীমা বাড়ানোর দাবি জানান যাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নে আরও বৃহৎ পরিসরে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়।

উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য

ত্রিপুরা সরকারের এই পর্যটন উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো:

  • পর্যটন ক্ষেত্রকে রাজস্বের একটি বিকল্প উৎসে রূপান্তরিত করা
  • স্থানীয় হস্তশিল্প ও সংস্কৃতিকে বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরা
  • যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা
  • রাজ্যের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও স্থলচিত্র সংরক্ষণ ও আধুনিকীকরণ

মুখ্যমন্ত্রী সাহা বলেন, “ত্রিপুরার পর্যটন পটভূমি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। রাজ্যে এমন অনেক স্থান রয়েছে যা ঐতিহাসিক, প্রাকৃতিক এবং ধর্মীয় গুরুত্বে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই এই স্থানগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে জায়গা পাক।”

৩৪ কোটি টাকার প্রকল্পে কোন কোন পর্যটন কেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত

এই নতুন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে রাজ্যের একাধিক দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র। ত্রিপুরার উত্তর, দক্ষিণ, ধলাই, খোয়াই এবং সিপাহীজলা জেলার অন্তত ১০টি কেন্দ্রীয় পর্যটন কেন্দ্র এই উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় এসেছে।

পর্যটন কেন্দ্রপ্রস্তাবিত কাজআনুমানিক ব্যয় (₹ কোটি)
উনকোটিলাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো, রাস্তা উন্নয়ন৭.৫
নীরমহলবোটিং জেটি ও জলে চলাচলের নিরাপত্তা৪.৮
চবিমুড়াপাথরের খোদাই সংস্কার, প্রোমেনেড নির্মাণ৩.২
আগরতলা রাজবাড়িডিজিটাল গ্যালারি, ইন্টেলিজেন্ট গাইড৪.৫
ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরধর্মীয় পর্যটন রুট, বিশ্রামাগার৫.০
রক গার্ডেনউদ্যান আধুনিকীকরণ২.০
ডামবুর লেকইকো রিসর্ট ও জলভ্রমণ স্টেশন৩.০
জয়ন্তিয়া পাহাড়ট্রেকিং রুট ও কটেজ১.৮
দেবতামুড়াঅ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পিং সাইট১.৫
ঊনকোটি মিউজিয়ামইন্টেলিজেন্ট ট্যুর গাইড, VR প্রযুক্তি০.৭

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি: EAP সীমা বৃদ্ধি হোক

এই প্রকল্পের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রের কাছে EAP (Externally Aided Projects) এর অনুমোদিত সীমা ১২০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০০ কোটি টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, ত্রিপুরার মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, “আমরা চীন, জার্মানি এবং জাপানের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা করতে চলেছি। EAP সীমা বাড়লে ত্রিপুরা বাস্তবিক অর্থেই উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি মডেল রাজ্যে পরিণত হতে পারে।”

কেন EAP সীমা বৃদ্ধি জরুরি?

ত্রিপুরা একটি ছোট রাজ্য হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্তবর্তী প্রেক্ষাপট এবং উন্নয়ন অসমতা EAP-এর প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ৮টি প্রকল্প EAP অর্থায়নে চলছে, যার মধ্যে রয়েছে পানীয় জল সরবরাহ, সড়ক উন্নয়ন, কৃষি আধুনিকীকরণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প।

বছরঅনুমোদিত EAP সীমা (₹ কোটি)ব্যবহৃত বরাদ্দ (₹ কোটি)প্রস্তাবিত বৃদ্ধি
২০১৯৮০০৭৫৪
২০২২১২০০১১৫০
২০২৫ (প্রস্তাবিত)২০০০৮০০

রাজ্যে পর্যটনের সম্ভাবনা

ত্রিপুরা পর্যটনের সম্ভাবনাময় রাজ্য হলেও অবকাঠামো ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক প্রচারের অভাবে যথাযথ পর্যটক টানতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার মনে করছে, একবার এই ৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২০২৬ সালের মধ্যেই পর্যটক সংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে।

পর্যটন বিভাগের এক আধিকারিক বলেন, “ত্রিপুরায় পর্যটন মৌসুম (নভেম্বর–মার্চ) কেন্দ্র করে বছরে প্রায় ১.৮ লাখ পর্যটক আসেন। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক হোটেল ও গাইডিং সিস্টেম তৈরি হলে বছরে ৪ লক্ষ পর্যটক পাওয়া সম্ভব।”

স্থানীয় প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল, হোটেল মালিক, হস্তশিল্পী এবং পরিবহন সংস্থাগুলি এই ঘোষণাকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। তারা মনে করছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুধু পর্যটন নয়, সমগ্র অর্থনীতিতে গতি আসবে। পাশাপাশি, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

একজন স্থানীয় পর্যটন গাইড বলেন, “আমরা চাই উন্নয়ন। মুখ্যমন্ত্রী সাহা যেভাবে আগ্রহ নিয়ে কাজ করছেন, আশা করছি পর্যটনে একটা বিপ্লব ঘটবে।”

আগামী পরিকল্পনা

রাজ্য সরকার আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে। পর্যটন ও সংস্কৃতি দপ্তর, নগরোন্নয়ন সংস্থা এবং বেসরকারি অংশীদারদের সমন্বয়ে এই কাজ এগোবে।


Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যের ভিত্তিতে রচিত। এখানে ব্যবহৃত সকল পরিসংখ্যান ও বক্তব্য রাজ্য সরকারের ঘোষণা ও বিভিন্ন দপ্তরের মন্তব্যের উপর নির্ভরশীল। উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও নির্ধারিত অর্থ বরাদ্দ সময়সীমা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *