ত্রিপুরা আর অনুপ্রবেশকারীদের ‘সেফ জোন’ নয়: মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা

ত্রিপুরা রাজ্য এখন আর অনুপ্রবেশকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল নয়, বলে স্পষ্ট জানালেন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মানিক সাহা। রবিবার রাজধানী আগরতলায় এক সরকারি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) ও রাজ্য পুলিশের কঠোর নজরদারি এবং কেন্দ্রের সমন্বিত নীতির কারণে ত্রিপুরার সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের প্রবণতা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য

মানিক সাহা বলেন,

“আগে ত্রিপুরা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য সেফ জোন ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। আমাদের সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তি, কাঁটাতার, ড্রোন এবং বিশেষ ভিজিল্যান্স টিমের কারণে এই প্রবণতা কমেছে।”

তিনি আরও জানান, রাজ্য সরকারের কড়া পদক্ষেপ ও কেন্দ্রের সহযোগিতায় সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা অনেক বেশি মজবুত হয়েছে।

ত্রিপুরায় অনুপ্রবেশ: পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা

বছরঅনুপ্রবেশকারীদের গ্রেফতারপ্রত্যাবর্তন
2020186142
2021214190
2022132118
20239790
20245452

রাজ্য পুলিশ ও BSF এর তথ্য অনুযায়ী, 2020 সালে যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা ছিল প্রায় 186, 2024 সালে তা কমে হয়েছে মাত্র 54। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রমাণ করে সীমান্তে নজরদারি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার কার্যকারিতা।

সীমান্তে নেওয়া নতুন পদক্ষেপসমূহ

  1. ইলেকট্রনিক সার্ভেইল্যান্স: BSF সীমান্তে CCTV, সেন্সর ও ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে।
  2. স্মার্ট ফেন্সিং: পশ্চিম ত্রিপুরার মেলাঘর, বক্সনগর, সিপাহীজলা জেলার 72 কিমি সীমান্তে স্মার্ট ফেন্সিং সম্পূর্ণ হয়েছে।
  3. স্থানীয় তথ্যদাতাদের নেটওয়ার্ক: সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে সমন্বয় করে সন্দেহজনক গতিবিধির খবর সংগ্রহ।
  4. ** المشترك অভিযান:** BSF ও রাজ্য পুলিশের যৌথ অভিযান বাড়ানো হয়েছে, বিশেষ করে নদীপথ ও জঙ্গল এলাকায়।

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি: নাগরিক নিরাপত্তায় অগ্রাধিকার

মানিক সাহা বলেন,

“আমাদের সরকার জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও সন্ত্রাসবাদ রোধে কোনো আপস নেই।”

তিনি জানান, শুধুমাত্র ত্রিপুরা নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্যই এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

রাজ্যের বিরোধী দলগুলির একাংশ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানালেও সীমান্তে কাঁটাতার প্রকল্পের ধীরগতির সমালোচনা করেছে। সিপিএমের মুখপাত্র বলেন,

“সীমান্ত সুরক্ষা ভালো হচ্ছে, তবে এখনো 100% কাঁটাতার কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।”

সীমান্ত নিরাপত্তার গুরুত্ব

ত্রিপুরা বাংলাদেশের সাথে 856 কিমি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে। এর মধ্যে 90% কাঁটাতার থাকলেও কিছু জায়গা নদী, জঙ্গল ও বসতিবহুল হওয়ায় সেখানে নজরদারি কঠিন। ফলে অনুপ্রবেশ, মানবপাচার ও গবাদি পশু চোরাচালানের প্রবণতা ছিল বহুদিন ধরেই।

সীমান্ত জেলাসীমান্তের দৈর্ঘ্য (কিমি)প্রধান চ্যালেঞ্জ
উত্তর ত্রিপুরা205পাহাড়ি অঞ্চল ও বনাঞ্চল
পশ্চিম ত্রিপুরা195নদী পারাপার
সিপাহীজলা130বসতিবহুল সীমান্ত
দক্ষিণ ত্রিপুরা300+জঙ্গল ও দুর্গম এলাকা

BSF এর বক্তব্য

ত্রিপুরা ফ্রন্টিয়ারের BSF IG পঙ্কজ সিং বলেন,

“আমরা প্রতিটি সম্ভাব্য পয়েন্টে নজরদারি বাড়িয়েছি। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও টহলদারি আমাদের কাজকে সহজ করেছে।”

তিনি জানান, BSF ইতিমধ্যেই সীমান্তে 24×7 ড্রোন পেট্রোলিং শুরু করেছে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর কড়া পর্যালোচনা সভা করছে।

জনমানসে প্রভাব

সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অনুপ্রবেশ কমায় তাদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বেড়েছে। বক্সনগরের এক বাসিন্দা বলেন,

“আগে রাতবিরেতে অনেক অজানা লোক আসত। এখন BSF-এর টহলদারি ও সার্চলাইটের কারণে পরিস্থিতি অনেক ভালো।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

গোয়াহাটির নিরাপত্তা বিশ্লেষক ডঃ জয়ন্ত বরা বলেন,

“ত্রিপুরা ভৌগোলিকভাবে অনুপ্রবেশের জন্য সুবিধাজনক। তাই প্রযুক্তি, স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্য এবং দ্রুত রেসপন্স টিমের সমন্বয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি সতর্ক করেন, সীমান্তরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় যুবসমাজের বিকাশে সরকারি উদ্যোগ না থাকলে চোরাচালান ও মানবপাচারের ঝুঁকি থাকবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা জানিয়েছেন, 2025 সালের মধ্যে ত্রিপুরা সীমান্তে 100% স্মার্ট ফেন্সিং সম্পূর্ণ করা হবে। এছাড়া, BSF-এর নতুন ব্যাটেলিয়ন এবং মর্ডান আর্মড ভেহিকল কেনা হবে।

উপসংহার

ত্রিপুরা সরকারের মতে, সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তি, কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয় জনসম্পৃক্ততার ফলে রাজ্য এখন আর অনুপ্রবেশকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে সীমান্তে নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও সমান জোর দিতে হবে।


Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনের উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনো প্রশাসনিক, নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক পরামর্শ নয়। সীমান্ত সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য সরকারী প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশিকা অনুসরণ করার অনুরোধ রইল। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *