ত্রিপুরা: মাদকসহ মা-ছেলেসহ তিনজন গ্রেফতার, পলাতক বাবা; উদ্ধার ১ লক্ষাধিক টাকার নিষিদ্ধ দ্রব্য

ত্রিপুরার মাদকবিরোধী অভিযানে ফের বড় সাফল্য পেল পুলিশ। রাজ্যের সোনামুড়া মহকুমার অন্তর্গত বক্সনগর থানা এলাকায় মা-ছেলেসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং উদ্ধার হয়েছে এক লক্ষাধিক টাকার নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য। অভিযুক্তদের পরিবারপতি তথা প্রধান অভিযুক্ত এখনও পলাতক। পুলিশের দাবি, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের অবৈধ কারবার কীভাবে গোটা সমাজব্যবস্থাকে গ্রাস করছে।

ঘটনার বিস্তারিত

রবিবার গভীর রাতে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বক্সনগর থানার পুলিশ একটি বাড়িতে হানা দেয়। তল্লাশি চালিয়ে তারা উদ্ধার করে ১ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের ব্রাউন সুগার ও ইয়াবা ট্যাবলেট।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিসম্পর্কবয়সঠিকানাউদ্ধার সামগ্রীআনুমানিক বাজারমূল্য
তহমিনা খাতুনমা৪৫বক্সনগরব্রাউন সুগার (৫০ গ্রাম)₹৭৫,০০০
আমজাদ আলিছেলে২২বক্সনগরইয়াবা ট্যাবলেট (৩০০ পিস)₹৩০,০০০
রফিকুল ইসলামপরিবারের আত্মীয়৩৫বক্সনগরসহযোগিতা ও লেনদেন

পলাতক বাবা

অভিযুক্ত পরিবারের কর্তা আব্দুল কাদের পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে গ্রেফতার করতে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। তিনি এই চক্রের মূল মস্তিষ্ক বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

পুলিশের বক্তব্য

সিপাহীজলা জেলার পুলিশ সুপার বলেন, “এই পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায় যুক্ত। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে এবং গোপন তথ্যের উপর ভিত্তি করে অভিযান চালানো হয়েছে। আমরা চাই সমাজ থেকে এই মাদকনেশার অভিশাপ মুছে ফেলতে।”

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

এলাকার এক প্রবীণ নাগরিক জানান, “মাদক ব্যবসার জন্য যুবসমাজ ধ্বংস হচ্ছে। প্রশাসনের এই ধরনের অভিযান আরও জোরদার হওয়া উচিত। পরিবারের সবাই যখন জড়িয়ে পড়ে, তখন সমাজে নেতিবাচক বার্তা যায়।”

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনার পর বিজেপি ও বিরোধী সিপিএম দুই পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করেছে। সিপিএম নেতা মানিক দে বলেছেন, “রাজ্য সরকার শুধু কাগজে কলমে অভিযান চালাচ্ছে। আসল মাফিয়ারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।” পাল্টা বিজেপি নেতৃত্ব জানায়, “ত্রিপুরার ইতিহাসে এই ধরনের কঠোরতা আগে কখনও দেখা যায়নি।”

মাদক চক্রের নেটওয়ার্ক

ত্রিপুরা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা জানিয়েছে, ব্রাউন সুগার, ইয়াবা ট্যাবলেট ও হেরোইন মূলত বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসে। তারপর তা বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে আগরতলা, সোনামুড়া, উধয়পুর হয়ে দেশের অন্য রাজ্যে পৌঁছায়।

ধরা পড়া মাদকউৎপত্তিগন্তব্যস্থানীয় এজেন্ট সংখ্যা
ব্রাউন সুগারবাংলাদেশআগরতলা, গৌহাটিপ্রায় ২৫
ইয়াবা ট্যাবলেটমায়ানমার ও বাংলাদেশউত্তর-পূর্ব ভারতপ্রায় ৪০
হেরোইনমায়ানমারমেঘালয়, মণিপুরপ্রায় ১৫

সামাজিক প্রভাব

এই ধরনের পরিবারের সম্পূর্ণভাবে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া নিয়ে সমাজকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শিশু ও কিশোরদের উপর এর প্রভাব ভয়াবহ। নেশার জন্য স্কুলছাত্ররাও ধীরে ধীরে যুক্ত হচ্ছে এই ব্যবসায়।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. রতন দেববর্মা বলেন, “মাদক শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও পরিবারকে ভেঙে দেয়। মা-ছেলে জেলে গেলে ছোট সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং জরুরি।”

সরকারের পরিকল্পনা

ত্রিপুরা সরকার ইতিমধ্যেই মাদকমুক্ত রাজ্য গড়তে নেশামুক্তি অভিযান শুরু করেছে। স্কুল ও কলেজে সচেতনতা শিবির, সীমান্তে BSF-এর চেকপোস্ট বৃদ্ধি এবং পুলিশকে আধুনিক ড্রোন ও প্রযুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

উপসংহার

ত্রিপুরার বক্সনগরের এই ঘটনা রাজ্যের মাদক চক্রের নৃশংস বাস্তবতাকে আরও একবার প্রকাশ্যে আনল। প্রশাসনকে যেমন কড়া হাতে দমন করতে হবে, তেমনি সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারই যদি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে – এমনটাই মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি পুলিশি সূত্র, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকাশিত সংবাদ তথ্যের উপর ভিত্তি করে রচিত। মাদকদ্রব্যের ধরন, উদ্ধার পরিমাণ, মূল অভিযুক্তদের পরিচয় ও আনুমানিক বাজারমূল্য প্রশাসনিক বিবৃতির উপর নির্ভরশীল। কোনও আইনি পদক্ষেপের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরের নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *