আগরতলায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ত্রিপুরার রাজপরিবারের উত্তরসূরি ও তিপ্রা মথার প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত কিশোর মাণিক্য দেববর্মার সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে। তিনি দাবি করেছেন যে, “ত্রিপুরার জনগণকে বুঝতে হবে আসল মালিক কারা”, যা ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। অনেকেই মন্তব্যটিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারকে সামনে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলেও, বিরোধীরা একে নির্বাচনের আগে সস্তা রাজনীতির কৌশল বলে অভিহিত করেছেন।
ত্রিপুরা কংগ্রেসের এক বিধায়ক এই মন্তব্যকে সরাসরি “নির্বাচন পূর্ব হতাশার প্রকাশ” বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর মতে, তিপ্রা মথা জনসাধারণের কাছে কার্যকর উন্নয়নমূলক রূপরেখা দিতে ব্যর্থ হওয়ায়, প্রদ্যোত এখন আবেগতাড়িত বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
‘মালিক’ মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক
প্রদ্যোতের বক্তব্যের মূল সুর ছিল এই যে, ত্রিপুরার আদিবাসীরাই রাজ্যের প্রকৃত মালিক, অথচ তাঁদের স্বার্থ বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। এর ফলে দুটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—
- সমর্থকরা এটিকে আদিবাসী পরিচয় ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই বলে ব্যাখ্যা করছেন।
- বিরোধীরা, বিশেষ করে কংগ্রেস ও বিজেপি, একে বিভাজন সৃষ্টিকারী মন্তব্য আখ্যা দিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল বলছেন।
কংগ্রেস বিধায়কের পাল্টা আক্রমণ
ত্রিপুরার কংগ্রেস বিধায়ক স্পষ্ট ভাষায় জানান—
- প্রদ্যোতের মন্তব্য হতাশার বহিঃপ্রকাশ, কারণ নির্বাচনের আগে তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।
- তিপ্রা মথা এখনো পর্যন্ত আদিবাসী উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনও কার্যকর রূপরেখা দিতে পারেনি।
- কংগ্রেসের দাবি, প্রদ্যোত শুধুমাত্র পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি করে ভোটের হিসেব কষছেন।
- তাঁর এই মন্তব্য প্রকৃতপক্ষে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার কৌশল।
তিপ্রা মথার রাজনৈতিক অবস্থান
২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে তিপ্রা মথা দ্রুতই রাজ্যের আদিবাসী ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে তাদের ‘গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড’ দাবিই দলটিকে শক্ত অবস্থান এনে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে দলটি একাধিক সমস্যার মুখে পড়েছে—
- জোটের অনিশ্চয়তা: বিজেপির সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়া।
- শাসন ঘাটতি: ADC শাসনকালে বড় কোনও উন্নয়নমূলক পরিবর্তন না আনা।
- নেতৃত্ব নির্ভরতা: প্রদ্যোতের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বের ঘাটতি।
তুলনামূলক টেবিল: তিপ্রা মথা বনাম কংগ্রেস
| বিষয় | তিপ্রা মথা | কংগ্রেস |
|---|---|---|
| ভোটারভিত্তি | আদিবাসী জনগোষ্ঠী | শহর, সংখ্যালঘু ও অ-আদিবাসী ভোটার |
| প্রধান ইস্যু | গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড, আদিবাসী অধিকার | সর্বজনীন উন্নয়ন, বিজেপি বিরোধিতা |
| শক্তি | রাজকীয় বংশ পরিচয়, আদিবাসী সংযোগ | সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, জাতীয় সমর্থন |
| দুর্বলতা | উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাব | আদিবাসী অঞ্চলে দুর্বল প্রভাব |
| বর্তমান কৌশল | পরিচয়ভিত্তিক আন্দোলন | বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা |
বিজেপির নীরব পর্যবেক্ষণ
কংগ্রেস প্রকাশ্যে আক্রমণ চালালেও বিজেপি আপাতত নীরব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি চাইছে কংগ্রেস ও তিপ্রা মথা পরস্পরের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকুক। এতে বিজেপি অ-আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ক আরও মজবুত করার সুযোগ পাবে।
জনমত বিভাজন
প্রদ্যোতের মন্তব্যে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন—
- আদিবাসী ভোটাররা সমর্থন জানাচ্ছেন, এটিকে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার ডাক হিসেবে দেখছেন।
- অ-আদিবাসী ভোটাররা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, বিভাজনের আশঙ্কা করছেন।
- সংখ্যালঘু ও শহুরে ভোটাররা বেশিরভাগই কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকছেন।
- তরুণ প্রজন্ম বিভক্ত—কেউ প্রদ্যোতের সাহসী ভাষণকে স্বাগত জানাচ্ছেন, কেউ আবার একে আবেগতাড়িত প্রচার বলে মনে করছেন।
ভোটার প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ
| ভোটার শ্রেণি | প্রতিক্রিয়া | সম্ভাব্য ফলাফল |
|---|---|---|
| আদিবাসী | সমর্থনমূলক, পরিচয় রাজনীতি শক্তিশালী | তিপ্রা মথার ভিত্তি মজবুত |
| অ-আদিবাসী (বাঙালি) | সমালোচনামূলক, বিভাজন আশঙ্কা | বিজেপি বা কংগ্রেসের দিকে ঝোঁক |
| সংখ্যালঘু সম্প্রদায় | সংশয়ী, কংগ্রেসমুখী | কংগ্রেসের ভোট বাড়তে পারে |
| তরুণ প্রজন্ম | বিভক্ত প্রতিক্রিয়া | নির্বাচনে ‘সুইং ফ্যাক্টর’ |
উপসংহার
ত্রিপুরার আসন্ন নির্বাচনে প্রদ্যোত কিশোরের “মালিক” মন্তব্য রাজনৈতিক লড়াইকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সমর্থকরা একে আদিবাসী আত্মপরিচয়ের দাবি হিসেবে দেখলেও, বিরোধীরা বলছে এটি আসলে নির্বাচনী কৌশল। কংগ্রেস বিধায়কের মন্তব্য অনুযায়ী, এই বক্তব্য মূলত প্রদ্যোতের হতাশা ও দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা।
বিজেপি যেখানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত, সেখানে কংগ্রেস ও তিপ্রা মথার এই সংঘাত আগামী নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে রাজ্যের রাজনীতি আগামী দিনে আরও উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি রাজনৈতিক মন্তব্য, জনমত ও চলমান পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন তথ্য বা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষণও পরিবর্তিত হতে পারে।
