ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাহুল সিংহের সাম্প্রতিক মন্তব্যে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত যে সীমান্ত সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে, তা পাকিস্তানের থেকে বেশি চীনের সাথেই। এই বক্তব্যকে হাতিয়ার করে কংগ্রেস বিজেপি সরকারকে কটাক্ষ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চীনা নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
কি বলেছেন সেনার উপপ্রধান রাহুল সিংহ?
সম্প্রতি একটি সামরিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাহুল সিংহ বলেন,
“আমরা মনে করি আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান। কিন্তু বাস্তবে আমাদের লড়াই চীনের সাথেই। পাকিস্তানকে আমরা সামলাতে পারি, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে সমান প্রস্তুতি ও কৌশল প্রয়োজন।”
তার এই মন্তব্য স্পষ্ট করছে, লাদাখ থেকে অরুণাচল – পুরো উত্তর সীমান্তে চীনা সেনার আগ্রাসনকে ভারতীয় সেনা কতটা গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে।
কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া
কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন,
“সেনার উপপ্রধানের মুখে স্পষ্ট হয়ে গেল, মোদী সরকার দেশবাসীকে চীন ইস্যুতে বিভ্রান্ত করছে। প্রধানমন্ত্রী একবারও চীনের নাম মুখে আনেননি। অথচ সেনা বলছে, লড়াই চীনের সাথেই।”
তিনি আরও বলেন,
“গালওয়ান সংঘর্ষে ২০ জন জওয়ান শহিদ হলেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, কেউ ঢোকেনি। আজ সেনা উপপ্রধানের মন্তব্যে সরকারের মিথ্যাচার প্রকাশ্যে চলে এসেছে।”
বিজেপির পাল্টা যুক্তি
বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র কংগ্রেসের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন,
“ভারতীয় সেনা ও সরকারের সমন্বয়ে সীমান্ত সুরক্ষা মজবুত হয়েছে। কংগ্রেসের আমলে চীন প্রতি পদে আগ্রাসন দেখিয়েছে, তখন কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”
তিনি দাবি করেন, এখন ভারত সীমান্তে প্রতিটি চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষ: সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বছর | এলাকা | সংঘর্ষের ধরন | ফলাফল |
|---|---|---|---|
| 2017 | ডোকলাম | মুখোমুখি অবস্থা | 73 দিনের পর সমঝোতা |
| 2020 | গালওয়ান | শারীরিক সংঘর্ষ | ২০ জওয়ান শহিদ, চীনেরও ক্ষয়ক্ষতি |
| 2022 | তাওয়াং | হাতাহাতি | 雙পক্ষীয় আহত, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে |
কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের অভিমত
প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অবঃ) অরুণ সাহা বলেন,
“সেনার উপপ্রধান বাস্তব পরিস্থিতিই তুলে ধরেছেন। পাকিস্তান একটি ট্যাকটিক্যাল থ্রেট, কিন্তু চীন স্ট্র্যাটেজিক চ্যালেঞ্জ। সীমান্তে রাস্তা, এয়ারবেস ও কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন জরুরি।”
ভারতের সীমান্তে চীনের সামরিক উপস্থিতি
সেনা গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, চীন তাদের পশ্চিম থিয়েটার কম্যান্ডে প্রায় ২০০,০০০ সৈন্য মোতায়েন করেছে। এছাড়া, লাদাখ ও অরুণাচল সীমান্তে অতিরিক্ত ড্রোন, রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।
| এলাকা | চীনের স্থাপনা | ভারতের কৌশলগত জবাব |
|---|---|---|
| লাদাখ | নতুন হেলিপ্যাড, সেনা ক্যাম্প | দ্রুত রাস্তা, ব্রিজ, আকাশপথ উন্নয়ন |
| অরুণাচল | অবকাঠামো ও সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি | সুমদোরোতে নতুন এয়ারবেস |
| সিকিম | সীমান্তে ট্যাঙ্ক ও মিসাইল ইউনিট | জওয়ান ও কামান মোতায়েন বৃদ্ধি |
চীনের প্রতিক্রিয়া
রাহুল সিংহের মন্তব্য নিয়ে চীনা বিদেশ মন্ত্রক এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দিলেও বেইজিং ভিত্তিক একটি সরকারি মুখপত্র লিখেছে,
“ভারতীয় সেনা নেতারা যুদ্ধমুখী কথা বলছে। তবে চীন সংঘাত নয়, শান্তি চায়। সীমান্ত সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব।”
সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর ইঙ্গিত
সেনার উপপ্রধান স্পষ্ট করেছেন, উত্তর সীমান্তে যুদ্ধাস্ত্র, গোলাবারুদ মজুত, রাস্তা ও এয়ারস্ট্রিপ উন্নয়নে ভারতীয় সেনা জোর দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও জানিয়েছে, লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (LAC)-এ ইন্টিগ্রেটেড ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডঃ সমরজ্যোতি বসু বলেন,
“কংগ্রেস এই ইস্যুতে রাজনৈতিক মাইলেজ নিতে চাইছে। তবে সত্যি কথা হল, চীন ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হুমকি। সরকার ও বিরোধী উভয়েরই উচিত সেনার কৌশলগত প্রস্তুতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া।”
উপসংহার
সেনার উপপ্রধানের এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, ভারতের কাছে পাকিস্তানের তুলনায় চীন বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক মহল একে কেন্দ্র সরকারের নীতির ব্যর্থতা বললেও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সীমান্ত সুরক্ষায় আরও বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনের উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনো সামরিক, কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক পরামর্শ নয়। সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য সরকারী নির্দেশিকা ও বিশেষজ্ঞ মতামত অনুসরণ করুন। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।
