পাকিস্তান আবারও মাসুদ আজহার ইস্যুতে ‘অজ্ঞতার’ অবস্থান নিল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, মাসুদ আজহার পাকিস্তানে আছে কি না সে সম্পর্কে ইসলামাবাদ অবগত নয়। জইশ-ই-মহম্মদের প্রধান ও আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত সন্ত্রাসবাদী মাসুদ আজহারকে নিয়ে পাকিস্তানের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির বক্তব্য
এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন,
“আমাদের কাছে মাসুদ আজহার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। তার অবস্থান কোথায় তা আমাদের জানা নেই। ভারত যদি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেয়, তবে আমরা খতিয়ে দেখবো।”
বিলাওয়াল ভুট্টোর এই মন্তব্যের পরেই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলি পাকিস্তানের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কে মাসুদ আজহার?
মাসুদ আজহার ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড টেরর লিস্টের শীর্ষে থাকা জইশ-ই-মহম্মদ প্রধান, যাকে 2019 সালে UN Security Council আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করে। 2001 সালের সংসদ হামলা, 2016 সালের পাঠানকোট হামলা এবং 2019 সালের পুলওয়ামা হামলার মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ভারত তাকে চিহ্নিত করেছে।
ভারতের অবস্থান
ভারত বহুবার পাকিস্তানকে মাসুদ আজহারকে হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছে। দিল্লির মতে, মাসুদ পাকিস্তানের বাহাওয়ালপুরে নিজের মাদ্রাসা থেকেই সংগঠন পরিচালনা করে।
ভারতের এক শীর্ষ কূটনৈতিক কর্মকর্তা বলেন,
“পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চাপ এড়ানোর জন্য বারবার বলে আসছে যে, মাসুদ আজহার নিখোঁজ। বাস্তবে তারা তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, এ কথা বিশ্ববাসী জানে।”
পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
| সংস্থা | মন্তব্য |
|---|---|
| FATF | পাকিস্তানকে টেরর ফান্ডিং ও সাপোর্ট নিয়ে সতর্ক করেছে |
| UN | মাসুদ আজহারকে হেফাজতে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে |
| USA | মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের এই অবস্থান তাদের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাকে নষ্ট করছে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও মাসুদ আজহার
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামরিক সমীকরণের জন্য মাসুদ আজহার ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। লাহোরের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ডঃ ফারহান খানের মতে,
“জইশ-ই-মহম্মদের মতো সংগঠন পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব তৈরি করে। তাই সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন।”
পাকিস্তানের অতীতের অবস্থান
পাকিস্তান সরকার বারবার দাবি করেছে যে মাসুদ আজহার অসুস্থ, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অথবা নিখোঁজ। 2020 সালে ইসলামাবাদ বলেছিল, “তিনি গুরুতর অসুস্থ, চলাফেরা করতে পারছেন না।” কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জানায়, সে নিয়মিতভাবে জইশ-ই-মহম্মদের কার্যকলাপ পরিচালনা করছে।
ভারতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ
ভারত UN, FATF এবং G20 মিটিংয়ে বারবার পাকিস্তানের দ্বিচারিতা তুলে ধরেছে। বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী বলেন,
“পাকিস্তান যদি সত্যিই সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে আন্তরিক হয়, তবে মাসুদ আজহারকে হস্তান্তর করুক। কথায় নয়, কাজে প্রমাণ দরকার।”
জইশ-ই-মহম্মদ ও ভারতের নিরাপত্তা
| হামলার বছর | স্থান | নিহতের সংখ্যা | হামলার ধরন |
|---|---|---|---|
| 2001 | সংসদ, দিল্লি | 9 | বন্দুক ও গ্রেনেড |
| 2016 | পাঠানকোট | 7 | বন্দুকধারী |
| 2019 | পুলওয়ামা | 40 (CRPF জওয়ান) | IED আত্মঘাতী হামলা |
পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, FATF-এর ধ Grey List থেকে বেরোতে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কিছু পদক্ষেপ নিলেও মাসুদ আজহার, হাফিজ সাঈদ, জাকিউর রহমান লখভির মতো বড় নেতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
গোয়াহাটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ডঃ অনুপম দত্ত বলেন,
“পাকিস্তান জানে, মাসুদ আজহারকে ধরলে অনেক জঙ্গি গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ তৈরি হবে। তাই বারবার অজ্ঞতার নাটক করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। একসময় হয়তো তাদের বাধ্য হয়েই ব্যবস্থা নিতে হবে।”
উপসংহার
মাসুদ আজহারকে নিয়ে পাকিস্তানের অজ্ঞতার নাটক নতুন নয়। তবে এবার সরাসরি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টোর এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইসলামাবাদ এখনো জইশ-ই-মহম্মদের মতো সংগঠনগুলিকে রক্ষা করছে। ভারতের মতে, এভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে ফেলে এই ধরনের সন্ত্রাসবাদী নেতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা প্রয়োজন।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনের উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনো কূটনৈতিক, নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক পরামর্শ নয়। সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে সরকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দেশিকা ও প্রজ্ঞাপন দেখতে হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।
