রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন তোলা বিজেপি বিধানসভা দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যকে তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত বলেই ব্যাখ্যা করলেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি সামিক ভট্টাচার্য। সম্প্রতি পূর্ব মেদিনীপুরের এক সভায় শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, “মুসলিমরা বিজেপিকে ভোট দেয় না”, যা নিয়ে বিরোধী দলগুলির পাশাপাশি দলের মধ্যেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
সামিক ভট্টাচার্যের বক্তব্য
রাজ্য বিজেপি সভাপতি সামিক ভট্টাচার্য বলেন,
“এটি সম্পূর্ণভাবে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত মন্তব্য। বিজেপির নীতি ও দর্শন সব ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য। আমরা কাউকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করি না।”
তিনি আরও জানান, বিজেপি সবসময় ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’ এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী এবং বাংলাতেও সেই নীতিই কার্যকর হবে।
শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যে কি বলেছিলেন?
পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে এক জনসভায় বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন,
“মুসলিমরা আমাদের ভোট দেয় না। তাই ওদের নিয়ে বেশি ভাবার দরকার নেই।”
এই বক্তব্যের পরেই তৃণমূল ও বাম নেতৃত্ব বিজেপিকে ধর্মীয় মেরুকরণের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন,
“বিজেপির আসল মুখোশ খুলে গেছে। ওরা সংখ্যালঘুদের নিয়ে কখনোই ভাবে না, বরং ভোটের সময় ব্যবহার করে।”
বিজেপির অন্দরমহলে বিতর্ক
দলের অন্দরমহলেও শুভেন্দুর মন্তব্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একাংশের মতে, এই ধরনের বক্তব্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি হতে পারে এবং বিজেপির অন্তর্ভুক্তির রাজনীতির বার্তাকে ক্ষুণ্ণ করে। তবে অন্য অংশের নেতারা বলছেন, বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়েই শুভেন্দু এই মন্তব্য করেছেন।
বিজেপির ভোট প্রাপ্তি ও মুসলিম ভোটব্যাংক
| বছর | নির্বাচনের ধরন | মুসলিম ভোটের আনুমানিক শতাংশ | বিজেপির মোট ভোট শতাংশ |
|---|---|---|---|
| 2014 | লোকসভা | 6-8% | 17% |
| 2016 | বিধানসভা | 8-10% | 10.2% |
| 2019 | লোকসভা | 9-11% | 40.2% |
| 2021 | বিধানসভা | 6-8% | 38.1% |
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, 2021 সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিম ভোটের বড় অংশ তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে চলে যায়। তবে বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে, বাংলায় ক্ষমতায় আসতে হলে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কেও আস্থা তৈরি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক ডঃ সমীরণ মৈত্র বলেন,
“এটি স্পষ্ট যে বিজেপি এখনও বাংলায় মুসলিম ভোটে বড় ধরনের ভরসা তৈরি করতে পারেনি। শুভেন্দুর বক্তব্যের ফলে সেই দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। তবে সামিক ভট্টাচার্য কৌশলগতভাবেই Damage Control করার চেষ্টা করছেন।”
তৃণমূলের কটাক্ষ
তৃণমূল মুখপাত্র জয়প্রকাশ মজুমদার বলেন,
“বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি বাংলায় কার্যকর হবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকল সম্প্রদায়কে নিয়ে চলেন বলেই বাংলার মানুষ তাঁর উপর আস্থা রাখে।”
সংখ্যালঘু নেতাদের প্রতিক্রিয়া
মুর্শিদাবাদ জেলার এক বিশিষ্ট মুসলিম শিক্ষাবিদ বলেন,
“এই ধরনের বক্তব্য মুসলিমদের আরও বেশি করে বিজেপি থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘু উন্নয়নের কথা বলেন, অন্যদিকে রাজ্যের নেতা উল্টো মন্তব্য করেন।”
বিজেপির ভবিষ্যৎ রণনীতি
সামিক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বিজেপি রাজ্যে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পৌঁছাতে চায়। তিনি বলেন,
“আমরা চাই মুসলিম সমাজ বুঝুক, বিজেপি তাদের বিরোধী নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোজগার – এই তিনটি ক্ষেত্রেই আমরা কাজ করতে চাই।”
বিজেপির সাম্প্রতিক সংখ্যালঘু উদ্যোগ
| বছর | উদ্যোগ | লক্ষ্য |
|---|---|---|
| 2020 | সংখ্যালঘু মোর্চা সম্মেলন | মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ নেতাদের সঙ্গে সংলাপ |
| 2021 | শিক্ষাবৃত্তি প্রকল্প | সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের UPSC/SSC কোচিং |
| 2022 | সংখ্যালঘু জনসংযোগ অভিযান | 12টি জেলার 3500 গ্রামের সংখ্যালঘু পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ |
| 2023 | সংখ্যালঘু যুব উদ্যোক্তা প্রকল্প | মুসলিম যুবকদের স্টার্টআপ ট্রেনিং |
উপসংহার
শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হলেও বিজেপি নেতৃত্ব Damage Control এ নেমেছে। সামিক ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এটি শুভেন্দুর ব্যক্তিগত মতামত, বিজেপির নয়। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিজেপি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা আরও মজবুত হতে পারে। তাই সামনের পুরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের আস্থা ফেরানো বিজেপির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনের উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনো রাজনৈতিক পরামর্শ, অভিমত বা নির্বাচনী বিশ্লেষণ নয়। সংবাদে উল্লিখিত বক্তব্যগুলি সংশ্লিষ্ট নেতাদের ব্যক্তিগত এবং প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ এই ধরনের মন্তব্যের জন্য দায়ী নয়। পাঠকরা বিষয়টি নিজস্ব বিচারবুদ্ধি দিয়ে মূল্যায়ন করবেন।
