কলকাতা শহরে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বড় পদক্ষেপ করল কলকাতা পুরসভা। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (KMC)-এর মাসিক অধিবেশন সম্পূর্ণভাবে বাংলায় পরিচালিত হয়। এর পাশাপাশি কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম সমস্ত দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং রেস্তোরাঁকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন— “শহরের প্রতিটি সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কেউ যদি এটা অমান্য করে, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই সিদ্ধান্ত কলকাতা শহরের ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন অনেকে। অন্যদিকে, রাজনীতির একাংশ একে “ভাষা-জাতিকতাবাদ” বলে অভিহিত করছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, “কলকাতা শহরের মূল পরিচয় তার ভাষা ও সংস্কৃতিতে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে বহু দোকান ও ক্যাফেতে দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র ইংরেজি বা হিন্দিতে লেখা সাইনবোর্ড। এটা শহরের ঐতিহ্যের পরিপন্থী। বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে এই শহরে ব্যবসা চলতে পারে না।”
তিনি জানান, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি দোকান ও হোটেলের বিরুদ্ধে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কলকাতা পুরসভার আইন অনুযায়ী, দোকান বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষা থাকতেই হবে।
পুরসভার নির্দেশ: বাংলা সাইনবোর্ড না থাকলে জরিমানা
নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সাইনবোর্ডে বাংলা না থাকলে প্রথমে সতর্কতা, পরে জরিমানা এবং প্রয়োজনে দোকান সিল করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
| পদক্ষেপ | বিবরণ |
|---|---|
| প্রথম পর্যায় | নোটিশ ও মৌখিক সতর্কতা |
| দ্বিতীয় পর্যায় | ₹৫,০০০ পর্যন্ত জরিমানা |
| তৃতীয় পর্যায় | লাইসেন্স বাতিল/দোকান সিল |
পুরসভা সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে দক্ষিণ কলকাতার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে অন্তত ৭টি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
অধিবেশন শুধুমাত্র বাংলায়: নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত
KMC-র মঙ্গলবারের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ আলোচনাই বাংলা ভাষায় হয়। পুরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডের প্রতিনিধিরা বাংলা ভাষাতেই বক্তব্য রাখেন। এমনকি, প্রেজেন্টেশন ও লিখিত প্রতিবেদনও বাংলায় ছিল।
একজন পুরকর্তা জানান, “যেহেতু আমরা বাংলা ভাষা প্রচার করতে চাই, তাই নিজেদের কর্মপদ্ধতিতেই তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আগামী দিনে অফিসিয়াল নথিপত্র ও ফর্মও বাংলায় প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
ব্যবসায়ী মহলের প্রতিক্রিয়া
নতুন নির্দেশে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া মিলেছে ব্যবসায়ী সমাজের। অনেকেই বলছেন, বাংলা ভাষা ব্যবহারে তারা ইতিমধ্যেই সচেষ্ট, তবে কিছু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বা ফ্র্যাঞ্চাইজি এই নিয়ম মানতে কিছুটা সময় চাইছে।
একজন জনপ্রিয় ক্যাফের মালিক বলেন, “আমরা সম্মান করি কলকাতার সংস্কৃতি। তবে আমাদের সাইনবোর্ড ডিজাইন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মেনে তৈরি হয়। বাংলা যুক্ত করতে চাই, তবে তা ডিজাইন ও অনুমোদনের বিষয়।”
নাগরিক সমাজ ও ভাষাপ্রেমীদের প্রতিক্রিয়া
ভাষাপ্রেমী ও নাগরিক সমাজের একাংশ এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। বাংলা ভাষা নিয়ে যেভাবে অন্য রাজ্যগুলিতে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, কলকাতাতেও সেই পদক্ষেপ জরুরি বলেই মত তাঁদের।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের কর্মী রমা ভট্টাচার্য বলেন, “বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, বাংলা আমাদের আত্মপরিচয়। তা রক্ষায় পুরসভার এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী।”
বিভিন্ন রাজ্যে মাতৃভাষা সংরক্ষণে নজির
অন্যান্য রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার সর্বোচ্চ হলেও বেসরকারি ক্ষেত্রে এখনও হিন্দি ও ইংরেজির প্রাধান্য বেশি। অথচ কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলিতে সরকারি ও বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই মাতৃভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
| রাজ্য | মাতৃভাষা | সাইনবোর্ডে বাধ্যতামূলক | ভাষা আইন |
|---|---|---|---|
| পশ্চিমবঙ্গ | বাংলা | নতুন নির্দেশ অনুযায়ী হ্যাঁ | চালু হচ্ছে |
| কর্ণাটক | কন্নড় | হ্যাঁ | কন্নড় ভাষা আইন, ১৯৮৫ |
| মহারাষ্ট্র | মারাঠি | হ্যাঁ | মারাঠি ভাষা আইন |
| তামিলনাড়ু | তামিল | হ্যাঁ | তামিল ভাষা প্রচার আইন |
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
পুরসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও প্রশাসন আশাবাদী। আগামী তিন মাসের মধ্যে সমস্ত দোকান ও রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড পরীক্ষা করে রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মেয়র হাকিম জানিয়েছেন, “আমরা কাউকে শাস্তি দিতে চাই না। আমরা চাই সবাই বাংলা ভাষার গুরুত্ব বুঝে স্বেচ্ছায় নিয়ম মানুক।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই বলেছেন, “অবশেষে বাংলা ভাষার প্রাপ্য মর্যাদা পাচ্ছে।” অন্যদিকে, কিছু ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, “যেখানে বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তির হার কমছে, সেখানে শুধু সাইনবোর্ডে বাংলা লিখে কি ভাষা রক্ষা সম্ভব?”
উপসংহার
কলকাতা শহরের ঐতিহ্য আর আত্মপরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ বাংলা ভাষা। পুরসভা তার মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন দেখার, এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য দপ্তর বা বেসরকারি ক্ষেত্রেও এই রীতি কতটা বিস্তার পায়।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন প্রশাসনিক সূত্র ও জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে। সরকারি আইন বা নির্দেশিকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। পাঠকদের অনুরোধ, বিষয়টি নিয়ে আরও নিশ্চিত তথ্যের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
