হুলক গিবনের রক্ষায় ত্রিপুরা সরকারের উদ্যোগ: বিপন্ন একমাত্র এপ সংরক্ষণে একশন প্ল্যান ঘোষিত

ত্রিপুরা সরকার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে ভারতের একমাত্র এপ প্রজাতি ‘হুলক গিবন’-এর রক্ষায় একটি বিস্তৃত ও সুসংহত ‘একশন প্ল্যান’ ঘোষণা করেছে। দেশজুড়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে এই পরিকল্পনা শুধুমাত্র একটি রাজ্যের পরিবেশ নীতিকে নয়, বরং একটি জাতীয় ঐতিহ্যকে রক্ষার লড়াই হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। হুলক গিবন, যার অস্তিত্ব এখন কেবলমাত্র উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি অরণ্যে সীমাবদ্ধ, ক্রমাগত বনাঞ্চল হ্রাস ও শিকারজনিত কারণে বিলুপ্তির পথে।


ত্রিপুরা সরকারের পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য:

ত্রিপুরা বন দফতর ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই পরিকল্পনার মাধ্যমে হুলক গিবনের আবাসস্থল সংরক্ষণ, প্রজনন বৃদ্ধি, খাদ্যচক্র রক্ষা, বনবাসীদের সহাবস্থান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে বনাঞ্চলের ভৌগোলিক পরিসীমা চিহ্নিতকরণ থেকে শুরু করে, বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও ডেটা সংগ্রহের উপরে জোর দেওয়া হয়েছে।


হুলক গিবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বৈজ্ঞানিক নামHoolock hoolock (Western Hoolock Gibbon)
পরিবারHylobatidae
প্রজাতিএকমাত্র ভারতীয় এপ, গিবন জাতীয়
বর্তমান বাসস্থানত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড
আইইউসিএন মর্যাদাEndangered (বিপন্ন)
বিশেষত্বঅতি চঞ্চল, গলায় গহ্বরযুক্ত উচ্চস্বরে ডাক, মনোগ্যামি

একশন প্ল্যানের গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ

বিষয়বিবরণ
বনাঞ্চল সংরক্ষণজিরানিয়া, গোমতী, দক্ষিণ ত্রিপুরা, ও ধর্মনগরের সংরক্ষিত বনকে চিহ্নিত ও উন্নয়ন
আর্থ-উদ্ভিদগত জরিপহুলক গিবনের বাসযোগ্য উদ্ভিদের তালিকা নির্ধারণ ও রোপণ
প্রাকৃতিক চলাচলের করিডোরবনাঞ্চলের মধ্যে করিডোর তৈরি করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে চলাচল সহজ করা
জেনেটিক গবেষণাগিবনের স্বাস্থ্য ও বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ
জনসচেতনতাস্থানীয় সম্প্রদায়কে প্রশিক্ষণ ও বিদ্যালয়ে শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম
বনবাসীদের বিকল্প জীবিকাগাছ কাটা ও শিকার বন্ধে বিকল্প জীবিকা পরিকল্পনা
নজরদারি ও প্রযুক্তিট্র্যাপ ক্যামেরা, জিপিএস ট্র্যাকিং, ড্রোন ব্যবহার

হুলক গিবনের প্রধান হুমকি:

  1. বনভূমি ধ্বংস – নির্বিচারে গাছ কাটা ও ভূমি রূপান্তরের ফলে বাসস্থান সংকুচিত
  2. মানব-প্রাণী সংঘর্ষ – কৃষি সম্প্রসারণ, খাদ্য সংকট এবং অবৈধ শিকার
  3. জেনেটিক বিচ্ছিন্নতা – বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রজননে সমস্যা
  4. অবৈধ বাণিজ্য – পোষা প্রাণী ও তাবিজ-তালিসমানিতে ব্যবহারের জন্য শিকার

বর্তমান সংখ্যা ও অবস্থান (ত্রিপুরা)

এলাকাঅনুমানিক সংখ্যাসংরক্ষণ অবস্থা
জিরানিয়া রেঞ্জ18-22 জোড়াউচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ
ধর্মনগর বনাঞ্চল12-15 জোড়ামাঝারি ঝুঁকি
গোমতী অঞ্চল5-8 জোড়াসংকটজনক
দক্ষিণ ত্রিপুরা3-5 জোড়াপ্রায় বিলুপ্ত

পরিবেশবিদদের মতামত

জীববিজ্ঞানী ডঃ অনিরুদ্ধ ধর বলেছেন,

“হুলক গিবন কেবল একটি প্রাণী নয়, এটি ভারতের জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের একটি সূচক। ত্রিপুরা সরকারের এই পদক্ষেপ যুগান্তকারী।”

আরেক পরিবেশ গবেষক জানান, “বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে এপ প্রজাতির গুরুত্ব অপরিসীম। এরা বনজ উৎপাদনে, পরাগায়নে, এবং গাছপালার বিস্তারে অনন্য ভূমিকা রাখে।”


কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা

ত্রিপুরা বন দফতর ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে যাতে এই উদ্যোগে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা আসে। এছাড়াও, জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এবং ন্যাশনাল বায়োডাইভারসিটি অথরিটির সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হচ্ছে।


সচেতনতা ও স্থানীয়দের ভূমিকা

ত্রিপুরার বনাঞ্চলে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় সচেতনতা কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। তাঁদের কাছে হুলক গিবন একটি আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বহন করে বলে জানা যায়। সরকার তাঁদের প্রথাগত জ্ঞান ও সামাজিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সংরক্ষণ কর্মযজ্ঞে যুক্ত করছে।


ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ

ত্রিপুরা সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষ্য পূরণের কথা জানিয়েছে:

  • ৫০% বাসস্থান পুনরুদ্ধার
  • প্রজনন হারে ২০% বৃদ্ধি
  • হুমকির মাত্রা ৩০% হ্রাস
  • বনবাসীদের মধ্যে সচেতনতা ৮০% পর্যন্ত বৃদ্ধি

উপসংহার

ত্রিপুরা সরকারের এই পদক্ষেপ পরিবেশগত নীতিনির্ধারণে একটি মাইলফলক। হুলক গিবনের মতো একটি অনন্য প্রাণীকে সংরক্ষণ করার মধ্য দিয়ে সরকার শুধু একটি প্রজাতিকেই রক্ষা করছে না, বরং একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র, একটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের দিশা দেখাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে এই উদাহরণ অন্য রাজ্যগুলোকেও অনুপ্রাণিত করতে পারে।


Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন প্রাথমিক তথ্য, সরকারি ঘোষণা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত। তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনও অসঙ্গতি থাকলে, পাঠকগণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা থেকে নিশ্চিত তথ্য যাচাই করে নিতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *