ভূমিধসের পর ডিমা হাসাওতে ট্রেন চলাচল ফের শুরু, উত্তর-পূর্ব ভারতের যাত্রীদের স্বস্তি

অসমের ডিমা হাসাও জেলায় প্রবল বর্ষণের ফলে সৃষ্ট ভূমিধসে বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। রেল বিভাগের তৎপরতা ও দ্রুত সংস্কার কাজের ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ লাইনে পুনরায় যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

কি ঘটেছিল ডিমা হাসাওতে?

গত সপ্তাহে ডিমা হাসাও জেলার হাফলং ও নিউ হাফলং স্টেশনের মধ্যবর্তী অংশে টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসে যায়। এতে মাটির স্তর সরে গিয়ে লাইনের উপর বিপুল পরিমাণে কাদা, পাথর ও গাছপালা জমে যায়। ফলে ত্রিপুরা, মণিপুর, মিজোরাম এবং দক্ষিণ অসমের সঙ্গে শিলচর-গुवাহাটি-সিলচর রেলপথে সমস্ত যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্থগিত হয়।

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের পদক্ষেপ

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল (NFR) ঘটনার পরই জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার ও সংস্কার কাজ শুরু করে। প্রায় 500 শ্রমিক এবং 15টি বিশেষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এক সপ্তাহের মধ্যে লাইনের সমস্ত কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ট্র্যাক মেরামত করা হয়।

রেল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান,

“প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও আমাদের কর্মীরা দিনরাত এক করে কাজ করেছেন। রেলের নিয়মিত ইন্সপেকশন টিম ও ইঞ্জিনিয়াররা নিশ্চিত করেছেন যাতে পুনরায় চালুর পর কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।”

কোন কোন ট্রেন পুনরায় চালু হয়েছে?

ট্রেনের নামরুটবর্তমান স্ট্যাটাস
কান্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসশিয়ালদহ-আগরতলাপুনরায় চালু
হাফলং লোকাললামডিং-হাফলংপুনরায় চালু
জনশতাব্দী এক্সপ্রেসগুয়াহাটি-সিলচরপুনরায় চালু
পণ্যবাহী ট্রেনলামডিং-সিলচরনিয়মিত চলাচল শুরু

ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া

ডিমা হাসাওর স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বলেন,

“ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় আমাদের পণ্য আনা-নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সড়কপথে খরচ দ্বিগুণ হয়। ট্রেন পরিষেবা ফেরায় আমরা বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেলাম।”

শিলচর থেকে গুয়াহাটি যাওয়া এক যাত্রী জানান,

“বাইপাস বা বিকল্প সড়কপথে যেতে প্রায় 18 ঘণ্টা লাগছিল। ট্রেন চালু হওয়ায় এখন 10 ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।”

ভূমিধসের প্রধান কারণ

কারণপ্রভাব
অতিবৃষ্টিমাটি আলগা হয়ে যায়
অবৈধভাবে পাহাড় কাটাভূমি ক্ষয় বৃদ্ধি
বন উজাড়মাটির বাঁধন দুর্বল

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমা হাসাও জেলার ভূপ্রকৃতি এবং অতিবৃষ্টির কারণে প্রতি বর্ষায় ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে। এছাড়া, পাহাড়ি রাস্তা সম্প্রসারণ ও রেললাইন নির্মাণের সময় সঠিক ইকো-স্টাডি না করলে ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের রেল যোগাযোগের গুরুত্ব

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল ভারত সরকারের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অন্যতম স্তম্ভ। ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মণিপুরে খাদ্যপণ্য, ইস্পাত, সিমেন্ট এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠানোর একমাত্র কার্যকর উপায় এই রেলপথ।

রাজ্যপ্রধান রেল সংযোগপ্রভাবিত অঞ্চল
ত্রিপুরাআগরতলা-শিয়ালদহপশ্চিম ত্রিপুরা, ধলাই
মিজোরামভৈরবি-সিলচরলুংলাই, আইজল
মণিপুরজিরিবাম-সিলচরইম্ফল, জিরিবাম

রেল বিভাগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের জেনারেল ম্যানেজার বলেন,

“আমরা পাহাড়ি লাইনে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ডিজাস্টার রেসপন্স টিম তৈরি করছি। এছাড়া, প্রতিটি ল্যান্ডসলাইড প্রবণ এলাকায় আধুনিক স্লোপ স্ট্যাবিলাইজেশন পদ্ধতি এবং রিয়েল-টাইম রেইনফল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

পরিবেশবিদরা বলছেন, ভূমিধস রোধে শুধু রেল নয়, স্থানীয় প্রশাসন ও বন দপ্তরকেও সচেতন হতে হবে। নির্বিচারে বন উজাড় ও পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। না হলে প্রতি বছরই এই ধরনের সমস্যা দেখা দেবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবে।

উপসংহার

ডিমা হাসাওতে ট্রেন চলাচল ফের শুরু হওয়ায় যেমন যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পেয়েছেন, তেমনই প্রশাসনের ওপর দায়িত্ব বেড়েছে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে সঠিক পরিকল্পনা ও পূর্ব সতর্কতা গ্রহণের। উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে রেলপথের নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি, মত বিশেষজ্ঞদের।


Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনের উদ্দেশ্যে লেখা। এটি কোনো প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত বা নীতিগত পরামর্শ নয়। ট্রেন চলাচল ও যোগাযোগ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য রেলওয়ের অফিসিয়াল নির্দেশিকা দেখার অনুরোধ রইল। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *