বাংলা নারীশক্তির গর্ব নিয়ে যুগের পর যুগ সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজচিন্তায় কথা বলা হয়েছে। লালন থেকে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ – প্রত্যেকে বাংলার নারীর সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা ও সংগ্রামী চেতনাকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ধর্ষণ, নিগ্রহ, খুন, বাল্যবিবাহ, পাচার, নিখোঁজ ও পাচারবৃত্তির ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে – এই বাংলাই কি নারী-গর্বের রাজ্য?
বাংলার নারী-নিরাপত্তা চিত্র ২০২5
| বিভাগ | ২০২3 | ২০২4 | ২০২5 (অবধি) |
|---|---|---|---|
| ধর্ষণ মামলা | ২,৩৪১ | ২,৬৫২ | ১,৪১০ |
| বাল্যবিবাহ মামলা | ১,১১০ | ১,৩০৫ | ৭০৫ |
| নারী পাচার মামলা | ৪৮৩ | ৫২১ | ২৯৪ |
| গৃহবধূ নির্যাতন মামলা | ৭,৮৭০ | ৮,০৯৫ | ৪,১২৫ |
উৎস: পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ অপরাধ পরিসংখ্যান শাখা
বড় শহরেই সবচেয়ে বেশি হামলা
বিশ্লেষকদের মতে, কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ, নিগ্রহ ও পাচারের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। কলকাতার এক মহিলা পুলিশ আধিকারিক জানান, “ধর্ষণের ৬০ শতাংশ ঘটনায় অপরাধী পূর্ব পরিচিত। প্রতিবেশী, আত্মীয়, প্রেমিক বা পাড়ার পরিচিত যুবকরা এই কাজে লিপ্ত।”
বাল্যবিবাহের ‘অঘোষিত রাজধানী’
মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুরের গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ এখনও দুঃস্বপ্ন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৭০০-এর বেশি নাবালিকার বিয়ে রোখা হয়েছে। শিশুকল্যাণ কমিটির এক সদস্য বলেন, “দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও পাচারকারীদের চাপ – এই তিনের যুগলবন্দিতে নাবালিকারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।”
পাচারের জাল
বাংলা-নেপাল, বাংলা-বাংলাদেশ সীমান্তে বহু পাচারচক্র সক্রিয়। উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া থেকে বাংলাদেশে, উত্তর দিনাজপুর ও দার্জিলিং থেকে নেপালে পাচার বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার মেয়েরা এই জালে ঢুকে গেলে আর ফেরার রাস্তা থাকে না।
রাজ্য সরকারের উদ্যোগ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুলছাত্রীদের আর্থিক সাহায্য ও বাল্যবিবাহ রোধের চেষ্টা করছে। পুলিশ ও প্রশাসন যৌথভাবে ‘মেয়েদের জন্য সেফ সিটি প্রজেক্ট’ চালু করেছে। কলকাতায় ২৪ ঘণ্টার মহিলা হেল্পডেস্কও রয়েছে।
| প্রকল্প | লক্ষ্য | উপকারভোগী |
|---|---|---|
| কন্যাশ্রী | স্কুলছাত্রীদের শিক্ষায় স্থায়ী রাখা | ৮৬ লাখ + |
| রূপশ্রী | ১৮+ মেয়েদের বিবাহে এককালীন অনুদান | ৫.৪ লাখ + |
| সেফ সিটি | CCTV, লাইটিং, হেল্পডেস্ক | কলকাতা, শিলিগুড়ি |
নারীর মানসিক স্বাস্থ্য সংকট
কলকাতা মেডিকেল কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, “প্রতিদিন ধর্ষণ, নিগ্রহ, বধূ নির্যাতন ও হুমকির খবর দেখে মেয়েদের মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব তাদের পড়াশোনা, সম্পর্ক, চাকরি ও সামাজিকতার উপর পড়ছে।”
বিরোধীদের তোপ
বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস তিন দলই রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেছে। বিজেপির সাংসদ লকেট চ্যাটার্জি বলেন, “নারী নিরাপত্তায় বাংলার স্থান দেশজুড়ে নীচের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী শুধু প্রকল্প দেখিয়ে দায় এড়াতে পারেন না।” অন্যদিকে, সিপিএম নেত্রী সুজন চক্রবর্তী বলেন, “পুলিশ, স্থানীয় তৃণমূল নেতা ও প্রশাসনের মিলিত চক্রান্তেই এই ধর্ষণ ও পাচারের ঘটনা বেড়ে চলেছে।”
নারীর নিজস্ব লড়াই
তবে বাংলার নারীসমাজও থেমে নেই। বিভিন্ন ব্লকে ‘মহিলা সঙ্ঘ’, ‘আত্মরক্ষা কমিটি’ তৈরি হয়েছে। NGO ও সামাজিক সংগঠনগুলির উদ্যোগে ছাত্রীদের মার্শাল আর্ট, আইনি শিক্ষা ও হেল্পলাইন ব্যবহার শেখানো হচ্ছে।
উপসংহার
বাংলা সেই ভূমি যেখানে কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, সুকুমারী দে, মহাশ্বেতা দেবী, মেদিনী রায়রা জন্মেছেন। সেই বাংলাতেই আজ মেয়েরা বাড়ি থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছে, স্কুলছাত্রীদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, গৃহবধূরা পণের জন্য খুন হচ্ছেন।
তথ্য বলছে, প্রকল্প ও আইনি সহায়তা থাকা সত্ত্বেও জেলে যাওয়ার হার কম হওয়ায় অপরাধীরা সাহস পাচ্ছে। তাই আজ প্রশ্ন – এই বাংলাকে কি আমরা আবার নারী-গর্বের বাংলা হিসেবে গড়তে পারব, নাকি বাংলার মেয়েদের গল্প শুধুই হবে ভয় আর লড়াইয়ের?
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে লেখা। কোনও নীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে দয়া করে স্বতন্ত্র যাচাই ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
