বাংলার পটচিত্র – কাহিনী বলা ছবি, গানের সঙ্গে মিশে যাওয়া রঙের জাদু, যা একসময় গ্রামের দরবার থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছিল। আজ সেই পটচিত্র শিল্পই ধুঁকছে। শিল্পীরা লড়াই করছেন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, বাজারের চাহিদা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, সরকারি অবহেলা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে।
পটচিত্র শিল্পের ইতিহাস
পট শব্দের অর্থ কাপড় বা ক্যানভাস। এই শিল্পে কাপড়ের উপর হাতে তৈরি প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে মিথ, পুরাণ, সমাজ ও প্রকৃতির গল্প আঁকা হয়। এক একটি পটচিত্র কাহিনীভিত্তিক। কালীঘাট পট, মেদিনীপুর পট, নয়া পটচিত্র – বাংলার তিনটি প্রধান শাখা। বিশেষ করে বীরভূমের নয়া গ্রাম ও মেদিনীপুরের পটশিল্প বিখ্যাত।
| অঞ্চল | বিশেষত্ব | শিল্পীর সংখ্যা |
|---|---|---|
| বীরভূম (নয়া) | দেব-দেবীর কাহিনী, সমসাময়িক ঘটনা | ২৫০+ পরিবার |
| পশ্চিম মেদিনীপুর | রাধা-কৃষ্ণ, রামায়ণ, মহাভারত | ৩০০+ পরিবার |
| পূর্ব মেদিনীপুর | সামাজিক বার্তা, স্বাস্থ্য সচেতনতা | ১৫০+ পরিবার |
শিল্পীর জীবনসংগ্রাম
৭০ বছর বয়সী পটশিল্পী স্বপ্না চিত্রকর বলেন, “বাবা-ঠাকুরদার সময়ে পট বিক্রি করে সংসার চলত। এখন ১৫-২০ দিনেও একটাও পট বিক্রি হয় না।”
কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের হস্তশিল্প মেলার উপরই শিল্পীদের নির্ভরতা। স্থানীয় হাটে পর্যাপ্ত ক্রেতা নেই। স্কুল-কলেজে পটচিত্র শেখানোর উদ্যোগ কম।
প্রাকৃতিক রঙের সংকট
পটচিত্রে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক রঙ যেমন গাছের ছাল, কাঁসট, কাঁচা হলুদ, মধু – সেগুলির জোগানও কমে যাচ্ছে। রাসায়নিক রঙ ব্যবহার করলে পটচিত্রের মূল ঐতিহ্য নষ্ট হয়। শিল্পীরা বলছেন, “প্রাকৃতিক রঙের দাম বেশি। ক্রেতারা ৫০-১০০ টাকার পট চায়, তাই লোকসান হয়।”
নতুন প্রজন্মের অনীহা
একদিকে আর্থিক সংকট, অন্যদিকে প্রযুক্তি নির্ভর নতুন প্রজন্ম। স্কুলছাত্রীরা বলছে, “এই শিল্পে পরিশ্রম অনেক, রোজগার কম। চাকরির চেষ্টা করাই ভালো।” ফলে শিল্প রক্ষার লড়াই ক্রমশ কঠিন হচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দফতর ‘পটশিল্প গ্রাম’ তৈরি করেছে। হস্তশিল্প মেলা, GI ট্যাগ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, বিদেশি প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। তবে শিল্পীরা অভিযোগ করছেন, প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছায় না সবার কাছে।
| প্রকল্প | উদ্দেশ্য | অগ্রগতি |
|---|---|---|
| পটশিল্প গ্রাম | শিল্পীদের জন্য স্থায়ী কর্মশালা ও প্রদর্শনী কেন্দ্র | বীরভূমে আংশিক চালু |
| GI ট্যাগ | নকল রোধ, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি | ২০১৮ সালে পটচিত্র পেয়েছে |
| অনলাইন বিক্রি | বিশ্বব্যাপী ক্রেতা | সীমিত শিল্পীর সংযুক্তি |
সামাজিক বার্তা ও পটগান
পটশিল্পীরা শুধু ছবি আঁকেন না, গানও রচনা করেন। করোনাকালে ‘করোনা পট’ তৈরি করে স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা ছড়িয়েছেন।
উদাহরণ:
“করোনারে ভাই, দূরে থাকো ভাই,
মাস্ক পরো মুখে, সাবান ধোও হাত…”
এই ধরনের পটগান গ্রামের মানুষকে সচেতন করেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
২০২৩ সালে নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে বাংলা পটচিত্রের প্রদর্শনী হয়েছিল। এছাড়া লন্ডন, বার্লিন, সিঙ্গাপুরের একাধিক গ্যালারিতে বাংলার পটশিল্পীর কাজ বিক্রি হচ্ছে।
চাহিদা ও সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল মার্কেটিং ও স্কুল কারিকুলামে পটচিত্র অন্তর্ভুক্ত করলে শিল্পীরা টিকে থাকতে পারবেন। ফ্যাশন ডিজাইনে পটচিত্রের মোটিফ, গৃহসজ্জায় পটচিত্র ব্যবহার বাড়ছে।
উপসংহার
বাংলার পটশিল্পীরা আজও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রঙ মিশিয়ে ছবি আঁকছেন। তাঁদের জীবনের গল্পই যেন পটচিত্র – রঙিন, বেদনার্ত, তবুও লড়াইয়ের।
যদি সম্যক উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে এই শিল্পই বাংলার নতুন প্রজন্মকে গর্ব ও আত্মনির্ভরতার পথ দেখাতে পারে।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি সরকারি তথ্য, স্থানীয় শিল্পী ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে লেখা। কোনও বিনিয়োগ বা নীতি সিদ্ধান্তের আগে স্বতন্ত্র যাচাই করুন।
