ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি রাজ্যজুড়ে বিদ্যুৎমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ও ক্রমবর্ধমান আইনশৃঙ্খলার অবনতি রুখতে ১৪ জুলাই থেকে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আশীষ কুমার সাহা শুক্রবার আগরতলায় এক সাংবাদিক বৈঠকে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি জানান, “ত্রিপুরা সরকার মানুষের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপাচ্ছে। বিদ্যুৎ, পানীয় জল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম লাগামছাড়া। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভেঙে পড়েছে।”
কংগ্রেসের অভিযোগ
- বিদ্যুৎমূল্য বৃদ্ধি: ত্রিপুরা বিদ্যুৎ দপ্তর সম্প্রতি ১২-১৫% পর্যন্ত ইউনিট প্রতি মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বাড়বে বলে অভিযোগ।
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: কংগ্রেস নেতাদের দাবি, চুরি, ধর্ষণ, খুনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরাধীরা রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ প্রশাসন নির্বিকার।
- দমদার সরকার, হতভাগা জনগণ: আশীষ সাহা বলেন, “সরকার বড় বড় কথা বলছে। কিন্তু রেশন, বেকার সমস্যা, কৃষকের পাওনা – কোনও কিছুতেই সুরাহা নেই।”
আন্দোলনের রূপরেখা
| তারিখ | কর্মসূচি | স্থান |
|---|---|---|
| ১৪ জুলাই | জেলা সদর অফিস ঘেরাও | আগরতলা, উনা কোটি, ধলাই, সিপাহীজলা, গোমতি, দক্ষিণ ত্রিপুরা, খোয়াই, পশ্চিম ত্রিপুরা, উত্তর ত্রিপুরা |
| ১৫ জুলাই | বিক্ষোভ মিছিল | জেলা ও ব্লক স্তর |
| ১৬ জুলাই | ডেপুটেশন | ডিসি ও বিডিও অফিস |
কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য
ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেসের সহ-সভাপতি তাপস দে বলেন, “যখন কেন্দ্রীয় সরকার বলছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো আছে, তখন ত্রিপুরা সরকার সাধারণ মানুষের পকেট কেটে চলেছে।” তিনি আরও বলেন, “টেন্ডার কেলেঙ্কারি, নিয়োগ দুর্নীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি নিয়ে সরকার একেবারে নিশ্চুপ।”
রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
| বছর | উৎপাদন ক্ষমতা (MW) | চাহিদা (MW) | ঘাটতি (MW) |
|---|---|---|---|
| ২০২০-২১ | ৪৫০ | ৩৯০ | ৬০ |
| ২০২১-২২ | ৪৬০ | ৪০০ | ৬০ |
| ২০২২-২৩ | ৪৭৫ | ৪৩০ | ৪৫ |
| ২০২৩-২৪ | ৪৮০ | ৪৫০ | ৩০ |
বিদ্যুৎ দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, উৎপাদন ক্ষমতা কিছুটা বাড়লেও সিস্টেম লস ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে গ্রাহকদের উপর দাম বাড়ানোর বোঝা চাপছে।
জনজীবনে প্রভাব
বর্ধিত বিদ্যুৎবিলের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলি। আগরতলার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রণজয় সাহা বলেন, “শুধু বিদ্যুৎ নয়, প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়ছে। বিক্রি কমে যাচ্ছে, লাভ থাকছে না।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
গত ৬ মাসে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক উদ্ধার ও বেকার যুবকদের আত্মহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করছে কংগ্রেস। পুলিশের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুন ২০২৫ মধ্যে ৭৫টি খুনের মামলা, ৯২টি ধর্ষণ, ৪৫০টির বেশি চুরি ও ডাকাতির মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
ত্রিপুরা পুলিশের মুখপাত্র বলেন, “রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রয়েছে। প্রতিটি মামলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
বিজেপির পাল্টা দাবি
রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র নবেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, “কংগ্রেসের আন্দোলন জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা মাত্র। বিদ্যুৎমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় অনেক ভালো।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক সমরেশ দেববর্মা বলেন, “২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ত্রিপুরায় বিজেপি ভালো ফল করলেও কংগ্রেসের এই ধারাবাহিক আন্দোলন আসন্ন পঞ্চায়েত ও বিধানসভা ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।”
উপসংহার
ত্রিপুরা কংগ্রেসের এই রাজ্যব্যাপী আন্দোলন একদিকে সরকারকে চাপের মুখে ফেলতে চাইছে, অন্যদিকে দলীয় সংগঠনকেও মজবুত করার কৌশল হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ যে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, তা স্পষ্ট। তবে প্রশাসন ও বিজেপি নেতৃত্বের পাল্টা যুক্তি জনমত কতটা প্রভাবিত করে তা সময় বলবে।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য, সংবাদ সংস্থা এবং সরকারি তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রস্তুত। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। কোনও নীতি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দয়া করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেখুন।
