ত্রিপুরার আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছেন তিপ্রা মোথা প্রধান মহারাজা প্রদ্যোত কিশোর মাণিক্য দেববর্মা। তিনি সম্প্রতি ত্রিপুরা ত্রাইবাল এরিয়া অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (TTAADC)-এর অধীনে একটি স্বতন্ত্র তদন্ত প্যানেল গঠনের দাবি জানিয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হবে জেলা পরিষদ অঞ্চলে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের সনাক্ত ও চিহ্নিত করা।
এই আহ্বান এসেছে এমন এক সময়ে যখন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই জনসংখ্যাগত ভারসাম্য ও ভূমি অধিকারের প্রশ্নে উপজাতিদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রদ্যোত মাণিক্যর মতে, অবৈধভাবে অভিবাসনকারী ব্যক্তিরা শুধুমাত্র উপজাতিদের জীবনধারা ও সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করছে না, বরং গণতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যেও চাপ সৃষ্টি করছে।
উপজাতি জনসংখ্যার পরিবর্তন: এক নজরে
ত্রিপুরার জনসংখ্যায় উপজাতি ও অ-উপজাতিদের অনুপাত গত কয়েক দশকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৫১ সালে যেখানে উপজাতি জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৬৩.৭৭%, তা ২০২১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী কমে দাঁড়িয়েছে ৩১.৭৮%-এ।
| সাল | উপজাতি জনসংখ্যা (%) | অ-উপজাতি জনসংখ্যা (%) |
|---|---|---|
| ১৯৫১ | ৬৩.৭৭ | ৩৬.২৩ |
| ১৯৭১ | ৩৯.৩৮ | ৬০.৬২ |
| ২০২১ | ৩১.৭৮ | ৬৮.২২ |
এই পরিসংখ্যান পরিষ্কারভাবে দেখায় যে, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে, যার পেছনে অবৈধ অভিবাসন একটি প্রধান কারণ।
কী চাইছেন প্রদ্যোত মাণিক্য?
প্রদ্যোতের প্রস্তাব হলো, TTAADC-এর অধীনে একটি বিশেষ শনাক্তকরণ ও যাচাই প্যানেল (Special Identification and Verification Panel বা SIVP) গঠন করতে হবে, যা নিম্নলিখিত কার্যক্রম পরিচালনা করবে:
- ADC-এর আওতাধীন গ্রাম ও বসতিতে বসবাসরত ব্যক্তিদের আইনি নথিপত্র যাচাই
- স্থানীয় বুড়া, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় সন্দেহভাজনদের তথ্য সংগ্রহ
- সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য সুপারিশ প্রদান
- প্রাপ্ত তথ্যে ভিত্তি করে ত্রৈমাসিক রিপোর্ট জমা দেওয়া
প্রদ্যোত বলেন, “ত্রিপুরার ভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষায় আদিবাসী স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিলের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া জরুরি। শুধু রাজ্য সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় বাহিনী ভরসা করলে চলবে না।”
| SIVP প্যানেলের প্রস্তাবিত কাঠামো | বিবরণ |
|---|---|
| তথ্য সংগ্রহ | গ্রামভিত্তিক জরিপ ও বসতিতে ভৌত তদন্ত |
| নথি যাচাই | ভোটার কার্ড, ভূমি দলিল, রেশন কার্ড ইত্যাদি |
| স্থানীয় ইনপুট | বুড়া/উপজাতীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিবেদন |
| প্রশাসনিক সমন্বয় | পুলিশ ও বিএসএফের সঙ্গে সহযোগিতা |
| রিপোর্টিং | ADC সভায় রিপোর্ট উপস্থাপন |
ত্রিপুরা ADC ও ষষ্ঠ তফসিলের ভূমিকা
ত্রিপুরা ADC ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় গঠিত একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক সংস্থা। এই কাউন্সিল উপজাতিদের ভূমি, সংস্কৃতি ও ভাষার অধিকার রক্ষা করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু গত কিছু বছরে অভিযোগ উঠেছে, এই কাউন্সিলের ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না।
প্রদ্যোতের দাবির পেছনে এই যুক্তি কাজ করছে যে, ADC-এর নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা অনুযায়ী, তাদের উচিত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জনগণের অধিকার রক্ষা করতে আরও সক্রিয় হওয়া।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
তিপ্রা মোথা’র এই দাবি ইতোমধ্যে রাজ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। উপজাতি ছাত্র ইউনিয়ন, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন জাতিগত সংগঠন এই দাবিকে স্বাগত জানিয়েছে। অনেকে একে “আদিবাসীদের আত্মরক্ষার প্রয়াস” বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, কিছু মানবাধিকার কর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দল এ দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, কোনো প্যানেল যদি যথাযথ আইনগত কাঠামো ও নৈতিক দায়িত্ব ছাড়া পরিচালিত হয়, তবে তা বিভাজনমূলক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ত্রিপুরা বনাম অন্যান্য রাজ্যের তুলনা
ত্রিপুরার পাশাপাশি, আসাম, মেঘালয় এবং মিজোরামের মতো রাজ্যগুলিও অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আসামে NRC, মেঘালয়ে ILP এবং মিজোরামে উপজাতি পাস আইনের মতো বিধান কার্যকর রয়েছে।
| রাজ্য | অবৈধ অভিবাসন রোধের উদ্যোগ | জেলা পরিষদের ভূমিকা |
|---|---|---|
| আসাম | NRC, সীমান্ত পুলিশ | সীমিত |
| মেঘালয় | ILP (Inner Line Permit) | সক্রিয় |
| মিজোরাম | ILP, উপজাতি পাস আইন | দৃঢ় |
| ত্রিপুরা | প্রস্তাবিত প্যানেল | আলোচনাধীন |
আগামী দিনের দিকনির্দেশনা
ত্রিপুরা ADC প্যানেল নিয়ে একটি স্টাডি গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। এই প্যানেল গঠনের আগে সমস্ত আইনি পরিকাঠামো, সংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং সামাজিক প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।
প্রদ্যোত জানিয়েছেন, তিনি জেলা ও ব্লকে ব্লকে সভা করে আদিবাসীদের মতামত গ্রহণ করবেন এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ চাইবেন যাতে এই প্যানেলের কার্যকারিতা এবং আইনগত বৈধতা নিশ্চিত করা যায়।
Disclaimer: এই প্রতিবেদনটি কেবলমাত্র তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত সমস্ত পরিসংখ্যান, মতামত এবং রাজনৈতিক মন্তব্য স্থানীয় সংবাদ উৎস ও জনসাধারণের অভিমতের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। এই প্রস্তাবটি সরকার বা ADC কর্তৃক এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত নয়।
