নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও খুলনা | সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আরও একটি চাঞ্চল্যকর হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর পুরানা পল্টনে জনপ্রিয় ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকাণ্ডের শোক ও প্রতিবাদের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার খুলনায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করা হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম শীর্ষ নেতা ও শ্রমিক উইংয়ের কেন্দ্রীয় সংগঠক মুহাম্মদ মোতালেব শিকদারকে। সোমবার দুপুরে খুলনার সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে মাথায় গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর যখন দেশজুড়ে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকজন হাই-প্রোফাইল নেতার ওপর এই হামলা জনমনে চরম আতঙ্ক এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার বিবরণ: খুলনায় প্রকাশ্য দিবালোকে আক্রমণ
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সোমবার (২২ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে খুলনার সোনাডাঙ্গা মডেল থানাধীন মজিদ সরণি বা সার্জিক্যাল মোড় এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। মুহাম্মদ মোতালেব শিকদার এনসিপির খুলনা বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে খুলনায় দলটির একটি বড় বিভাগীয় শ্রমিক সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল, যার প্রস্তুতি তদারকি করছিলেন তিনি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মোতালেব শিকদার যখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাতপরিচয় দুই দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে। গুলির শব্দে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মোতালেব শিকদার রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে স্থানীয় জনতা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তার মাথার বাম পাশে গুলির আঘাত লেগেছে এবং রক্তক্ষরণ হয়েছে প্রচুর। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং বর্তমানে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এনসিপি ও ছাত্র-জনতার প্রতিক্রিয়া
এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এনসিপির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ এই ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চেষ্টার’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এনসিপির যুগ্ম-সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন:
“এনসিপির খুলনা বিভাগীয় প্রধান এবং এনসিপি শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মোতালেব শিকদারকে একটু আগে মাথায় গুলি করা হয়েছে। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বিপ্লবীদের রক্ত নিয়ে যারা খেলছে, তাদের পরিণতি ভয়াবহ হবে।”
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, গত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের টার্গেট করছে। শরীফ ওসমান হাদির পর মোতালেব শিকদারের ওপর এই হামলা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে তারা মনে করছেন।
পটভূমি: শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড ও দেশব্যাপী অস্থিরতা
মোতালেব শিকদারের ওপর এই হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ এবং বিক্ষুব্ধ। গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয় নগর এলাকায় এক নির্বাচনী প্রচারণার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ শরীফ ওসমান হাদি। গত বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা বিচার দাবিতে এবং ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগে দিল্লির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি তুলে রাস্তায় নামে। এই প্রতিবাদের জেরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। শনিবার দেশব্যাপী শোক পালনের পর সোমবারই খুলনায় এই দ্বিতীয় হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও সীমান্ত নিরাপত্তা
খুলনার সোনাডাঙ্গা মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, হামলার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, মোতালেব শিকদারের ওপর হামলার পর সীমান্ত এলাকাগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে যশোর ও বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে হামলাকারীরা যেন পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কড়া নজরদারি শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ পলাতক থাকায় এবার তারা কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ২০২৬-এর নির্বাচন
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই এই সিরিজ হামলার ঘটনা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এনসিপি, যা মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তাদের শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করা নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইতিমধ্যেই শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি বন্ধ না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ আরও গভীর সংকটে নিপতিত হতে পারে।
মুহাম্মদ মোতালেব শিকদারের ওপর এই হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বর্তমান ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। একের পর এক ছাত্র-শ্রমিক নেতাদের ওপর এই ধরণের ‘টার্গেট কিলিং’ প্রচেষ্টায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এখন দেখার বিষয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই ঘাতকচক্রকে রুখতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
তদন্তের অগ্রগতি এবং মোতালেব শিকদারের স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে সর্বশেষ আপডেট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
Disclaimer:
This report is for informational purposes only. SRK NATION BANGLA does not guarantee the absolute accuracy of these developing reports and holds no liability for any outcomes based on this content.
