গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে তারকা—সবাই। তবে টলিউডের তারকাদের ক্ষেত্রে এই ভোটদান যেন আরও বেশি করে চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। প্রতিবার নির্বাচনের মরসুমে টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ার অন্দরে রাজনীতির হাওয়া প্রবলভাবে বইতে শুরু করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভোটগ্রহণ কেন্দ্রগুলোতে তারকাদের উপস্থিতি এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল ছিল তুঙ্গে। কেউ ক্যামেরার সামনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের জয়গান গেয়েছেন, তো কেউ আবার গেরুয়া উত্তরীয় গলায় জড়িয়ে ভোট দিতে গিয়েছেন। এই বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক অবস্থানই যেন বর্তমান টলিউডের বাস্তব চিত্র।
তারকাদের রাজনৈতিক মেরুকরণ
টলিউডের অন্দরে রাজনীতির প্রবেশ কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে ইদানীং তারকাদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। কেউ সরাসরি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, আবার কেউ বা দলের হয়ে প্রচারের ময়দানে নেমেছেন। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সময়ও এই রাজনৈতিক পরিচিতি যেন তাদের পোশাকে বা আচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অনুগত শিল্পীরা যেমন তৃণমূলের পতাকাতলে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, তেমনই বিরোধী শিবিরের তারকাদের মধ্যেও দেখা গেছে গেরুয়া শিবিরের প্রতি বিশেষ ঝোঁক। এই মেরুকরণ শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, বরং তা টলিউডের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
ভোটকেন্দ্রে তারকাদের ঝলক
ভোটের দিন সকাল থেকেই বুথের সামনে তারকাদের দেখার জন্য ভিড় জমেছিল ভক্তদের। সাদা রঙের সাধারণ পোশাকে কেউ এসেছেন, আবার কেউ বা দলের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে পোশাক নির্বাচন করেছেন। তারকাদের এই উপস্থিতি শুধু ভোট দেওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায় তাদের মন্তব্য নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। কেউ সরাসরি কোনো দলের নাম না নিলেও, তাদের কথার বাচনভঙ্গিতে রাজনৈতিক ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। অন্যদিকে, প্রবীণ ও নবীন তারকাদের ভোট দেওয়ার ধরনও ছিল আলাদা। কেউ শান্তভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন, আবার কেউ বা ভিড় এড়িয়ে দ্রুত কাজ সেরে বেরিয়ে গিয়েছেন।
জনপ্রতিনিধি বনাম শিল্পী
একজন শিল্পী যখন রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন, তখন তার ব্যক্তিগত পরিচয় এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রেখা তৈরি হয়। ভোটের দিনে এই রেখাটি আরও ঝাপসা হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ যখন তাদের প্রিয় তারকাকে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতীক হাতে দেখেন, তখন তা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। ভক্তদের একাংশ খুশি হন প্রিয় তারকাকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখে, আবার একাংশ মনে করেন শিল্পের জগতে রাজনীতির ছোঁয়া শিল্পীর নিরপেক্ষতাকে নষ্ট করে। তবে টলিউডের এই বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যায়, রাজনীতি এখন টলিউড তারকাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন মানেই তো মতাদর্শের লড়াই। আর টলিউডের তারকারা যখন সেই লড়াইয়ে সরাসরি অংশ নেন, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। রাজনীতির এই রঙে রঙিন হওয়ার মাধ্যমে তারা যেমন নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছেন, তেমনই পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছেন তাদের অগুনতি ভক্তদের। দিনশেষে, কে কোন দলের হয়ে ভোট দিলেন বা কার গলায় কোন রঙের উত্তরীয় ছিল, তার চেয়েও বড় কথা হলো গণতন্ত্রের এই প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। শিল্প আর রাজনীতির এই মেলবন্ধন আগামী দিনে টলিউডকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারণ দিনের শেষে শিল্পীর পরিচয় তার কাজের মাধ্যমেই টিকে থাকে, যদিও রাজনীতির এই উত্তাপ তাকে প্রতিনিয়ত নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ করে দেয়।