রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাঝে বাংলাদেশ বর্তমানে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করেছে, যেখানে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৫০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৪৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলায় এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সংকট ও প্রেক্ষাপট
হামের এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে মূলত টিকাকরণ কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছর ধরে নিয়মিত টিকাকরণ কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে, যা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সর্দার শাখাওয়াত হোসেনের অভিযোগ, বিগত সরকারগুলোর অব্যবস্থাপনা এবং টিকাকরণ পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যর্থতার কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি। বিশেষ করে কোভিড অতিমারি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় টিকাকরণ কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
শিশুদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব
এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। আক্রান্তদের মধ্যে ৯১ শতাংশই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সি এবং এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুর সংখ্যা অন্তত ৭৯ জন। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে ৪৩ জন মারা গেলেও, একই সময়ে আরও ২১৬ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যাকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হামের পরোক্ষ প্রভাব হিসেবেই দেখছেন। আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে ভিড় বাড়ছে।
রাজনৈতিক দায় ও আইনি পদক্ষেপ
বর্তমান স্বাস্থ্য সংকটের জন্য মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সরাসরি দায়ী করছে বর্তমান প্রশাসন। ২০২৫ সালে শিশুদের টিকাকরণের হার কমে ৫৯.৬ শতাংশে নেমে আসায় প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এরই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আশরাফুল ইসলাম একটি আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন, যেখানে মহম্মদ ইউনূস ও তাঁর তৎকালীন উপদেষ্টামণ্ডলীকে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করা হয়েছে। হাইকোর্ট এই বিষয়ে সরকারের কাছে চার সপ্তাহের মধ্যে ব্যাখ্যা তলব করেছে যে, কেন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা দিল এবং কেন টিকাকরণ কর্মসূচি বেসরকারি খাতে ঠেলে দেওয়া হলো।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও করণীয়
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, টিকাকরণের হার দ্রুত বাড়ানো না গেলে হামের পাশাপাশি অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। আগামী কয়েক সপ্তাহ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু করলেও, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগামী দিনে টিকাকরণ ব্যবস্থাপনা কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে দেশবাসীর।