পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় এবং বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। এই পরিস্থিতিতে অভিনেতা এবং তৃণমূল সাংসদ দেব অধিকারীর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এক বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন দল হার স্বীকার করছে, অন্যদিকে দেবের এই বার্তা কি নিজের দলের অন্দরে থাকা কোনো ত্রুটিকে সামনে আনছে? বিশেষ করে টলিউডের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ‘ব্যান কালচার’ বা নির্বাসন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তার সোচ্চার অবস্থান নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
টলিউডের অস্বস্তি ও ব্যান সংস্কৃতির বিষবাষ্প
টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সময় শিল্পীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা ব্যান আরোপের অভিযোগ শোনা গেছে। অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে ইন্ডাস্ট্রির বৈঠকে দেব যেভাবে অনির্বাণ ভট্টাচার্যসহ অন্যান্য শিল্পীদের ওপর থেকে নির্বাসন তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন, তা ছিল সাহসের পরিচয়। ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে থাকা প্রভাবশালী মহলের সাথে, বিশেষ করে অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে তার সংঘাতের কথা কারও অজানা নয়। দেবের সাম্প্রতিক পোস্টে যখন তিনি নতুন সরকারের কাছে ‘নির্বাসিত করার সংস্কৃতি’ বন্ধের আহ্বান জানান, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিনি পরোক্ষভাবে নিজের দলের অন্দরে থাকা সেই ক্ষমতাধরদেরই বার্তা দিচ্ছেন যারা এতকাল ইন্ডাস্ট্রি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছেন।
রাজনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে উন্নয়নের স্বপ্ন
দেব শুধুমাত্র একজন অভিনেতা নন, তিনি ঘাটালের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিও বটে। তাই বিজেপির জয়ের পর তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্য সরিয়ে রেখে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য নতুন সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন। তার এই আবেদন প্রমাণ করে যে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানো এবং জীবিকার সুরক্ষাই তার কাছে প্রধান লক্ষ্য। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান দীর্ঘদিনের এক স্বপ্ন, যা বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন হবে। দেবের এই অবস্থান কি তবে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এক নতুন দিশার ইঙ্গিত?
শিল্প ও রাজনীতির সহাবস্থান
সিনেমা বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেব তার বার্তায় স্পষ্ট করেছেন যে, শিল্পের বিকাশ তখনই সম্ভব যখন সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান বজায় থাকে। তিনি নতুন সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যাতে শিল্পী স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। বিভেদ ও রাজনীতিকরণের বদলে ঐক্য এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। যখন তিনি বলছেন যে ‘নির্বাসিত করার সংস্কৃতি অতীত হওয়া উচিত’, তখন তিনি মূলত একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের দাবি জানাচ্ছেন, যেখানে শিল্পীর কণ্ঠ রুদ্ধ হবে না।
রাজনীতি এবং শিল্পের জটিল রসায়নে দেবের এই ভূমিকা নতুন প্রজন্মের কাছে এক ভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ভোটের হার-জিতের চেয়েও বড় বিষয় হলো মানুষের পাশে থাকা এবং সৃজনশীলতার পরিধিকে মুক্ত রাখা। কোনো দল বা মতাদর্শের অনুগত হওয়ার চেয়েও বড় পরিচয় হলো একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের দায়বদ্ধতা পালন করা। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং ঘাটালের মতো অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করতে দলমত নির্বিশেষে সম্মিলিত প্রয়াসই যে একমাত্র পথ, তা আজ দেবের এই মন্তব্যের মাধ্যমে আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। শিল্পের স্বাধীন বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের সুরক্ষাই হোক আগামীর চলার পথের মূলমন্ত্র, যা সমাজকে আরও সহনশীল ও সমৃদ্ধ করে তুলবে।