টলিউডের পরিচিত মুখ সৌরভ দাস। দীর্ঘ সময় ধরে অভিনয় জগতে নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে সম্প্রতি ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ ছবিতে অভিনয় করার পর থেকেই যেন তার জীবনে এক নতুন ঝড়ের সূচনা হয়। বিবেক অগ্নিহোত্রী পরিচালিত এই ছবিটি নিয়ে বাংলায় যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, তার আঁচ এসে পড়েছিল সরাসরি অভিনেতার ক্যারিয়ারে। এতদিন চুপ থাকলেও, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সৌরভ দাস তার সোশ্যাল মিডিয়ায় যে দীর্ঘ পোস্ট করেছেন, তা রীতিমতো তোলপাড় ফেলেছে টলিপাড়ায়।
মানসিক অত্যাচার ও কাজ হারানো
সৌরভ তার পোস্টে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে তাকে ইন্ডাস্ট্রির ভেতর থেকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের নির্দেশে তাকে কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, এমনকি তার পরিচিতদের ফোন করে সতর্ক করা হয়েছে তাকে কোনো প্রজেক্টে না নেওয়ার জন্য। এমনকী একটি ব্যান্ড বা মিউজিক প্রজেক্ট থেকেও তাকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি যে তীব্র মানসিক অত্যাচারের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তার ক্ষত আজও টাটকা। একজন শিল্পী হিসেবে নিজের পছন্দের কাজ করতে না পারার যন্ত্রণা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে।
পরিবারের পাশে না থাকার আক্ষেপ
একজন অভিনেতার কাছে নিজের প্রথম বলিউডের কাজের অভিজ্ঞতা সবসময়ই বিশেষ। কিন্তু সৌরভের ক্ষেত্রে সেই আনন্দ মাটি হয়ে গিয়েছিল পরিস্থিতির চাপে। তিনি জানিয়েছেন, তার পরিবার এই সাফল্য উদযাপন করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সিনেমাটি দেখার জন্য টাটানগর পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। এই ঘটনাটি একজন শিল্পীর কাছে কত বড় পরাজয় হতে পারে, তা তার পোস্টের প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে। হলের বাইরে বেরিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ফেলার সেই মুহূর্তটি আজও তার মনের মধ্যে গেঁথে আছে।
শিল্পের স্বাধীনতা ও কর্মফল
সৌরভ দাসের মতে, ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’-এ অভিনয় করার জন্য তাকে যেভাবে বয়কটের মুখে পড়তে হয়েছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তিনি দাবি করেছেন, ছবিটির চিত্রনাট্য তাকে পুরো দেওয়া হয়নি, মাত্র তিন দিনের স্ক্রিপ্ট ধরানো হয়েছিল। তবুও সেই চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সন্তুষ্ট। অনুপম খেরের মতো কিংবদন্তি অভিনেতার আশীর্বাদ তার পাথেয়। তিনি চান, ছবিটি আবারও বাংলায় মুক্তি পাক, যাতে সাধারণ মানুষ তার কাজ দেখার সুযোগ পান। তার কথায়, কর্মফল প্রত্যেককেই ভোগ করতে হয় এবং তিনি বিশ্বাস করেন সত্য এক সময় সামনে আসবেই।
সৌরভের এই খোলাখুলি স্বীকারোক্তি কেবল একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের সেই অন্ধকার জগতের প্রতিচ্ছবি, যেখানে মতাদর্শের পার্থক্যে প্রতিভার গলা টিপে ধরার চেষ্টা করা হয়। একজন শিল্পীর পরিচয় তার কাজের মাধ্যমে হওয়া উচিত, রাজনীতির মোড়কে তাকে নিষিদ্ধ করা বা তার রুজি-রোজগার কেড়ে নেওয়া কখনোই সুস্থ সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না। যখন একজন অভিনেতা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হন, তখন তা গোটা ইন্ডাস্ট্রির নৈতিকতার ওপরই প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়। শিল্পীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকুক, এটাই আজকের দিনের বড় প্রত্যাশা। যে লড়াই সৌরভ লড়ছেন, তা যেন আগামী দিনে অন্য কোনো শিল্পীকে আর লড়তে না হয়, কারণ শিল্পের কোনো সীমানা বা রাজনৈতিক রঙ থাকা উচিত নয়, তার একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত সৃজনশীলতা।