আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে এক প্রমোদতরীতে হান্টাভাইরাসের ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দিয়েছে, যার ফলে অন্তত তিন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। প্রায় ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা করা ‘এমভি হন্ডিয়াস’ (MV Hondius) নামক জাহাজটি আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে স্পেনের কানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় এই স্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং সংশ্লিষ্ট জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ‘ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস’ (Oceanwide Expeditions) এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
সংকট ও উদ্ধারকার্য
আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা এই প্রমোদতরীটি কাবো ভার্দে দ্বীপপুঞ্জে তিন দিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। আক্রান্তদের মধ্যে ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস এবং জার্মানির নাগরিকরা রয়েছেন। বিমানে করে এবং জাহাজের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার করে নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে আক্রান্তদের। বর্তমানে জাহাজটিতে ২৩টি ভিন্ন দেশের মানুষ অবস্থান করছেন, যাদের ওপর সার্বক্ষণিক চিকিৎসকদের নজরদারি চলছে।
হান্টাভাইরাস: উৎস ও সংক্রমণ প্রক্রিয়া
বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুর বা ছুঁচোর মূত্র, লালা বা বিষ্ঠা থেকে ছড়ায়। এই ভাইরাসের কণা বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। প্রমোদতরীর মতো আবদ্ধ স্থানে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা এই ঘটনার মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হলো। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ স্ট্রেইনটি এই সংক্রমণের জন্য দায়ী বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
লক্ষণ ও ঝুঁকির মাত্রা
হান্টাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিতে এক থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর, পেশির যন্ত্রণা ও পেটের সমস্যার মতো সাধারণ লক্ষণ দেখা দেয়, যা অনেক সময় শনাক্ত করতে বিলম্ব ঘটায়। আমেরিকায় এই ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, কারণ এটি সরাসরি ফুসফুসে তরল জমিয়ে শ্বাসকষ্ট তৈরি করে। তবে ইউরোপ ও এশিয়ার স্ট্রেনগুলোতে মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম, যা ১ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের সতর্কতা
বর্তমানে হান্টাভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট টিকা বা অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। চিকিৎসকরা মূলত রোগীকে ভেন্টিলেশন ও অক্সিজেনের মাধ্যমে সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে ক্রুজ শিপ বা প্রমোদতরীগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি কঠোর করার দাবি উঠেছে। সামনে এই ধরনের আন্তর্জাতিক ভ্রমণগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রোটোকল আরও জোরদার করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যে যারা ইতিমধ্যে বাড়ি ফিরেছেন, তাদের ওপরও দীর্ঘমেয়াদী নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে যাতে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।