চলচ্চিত্র এবং রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠার নজির বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ সিনেমাটি ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, তা যেন রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এক চরম নিদর্শন। পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীর তৈরি এই সিনেমাটি বাংলা প্রেক্ষাপটে নির্মিত হওয়া সত্ত্বেও, দীর্ঘ সময় পশ্চিমবঙ্গ থেকে ব্রাত্য ছিল। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দেশজুড়ে মুক্তি পেলেও, এ রাজ্যে ছবিটির প্রদর্শন নিয়ে তৈরি হয়েছিল এক বিশাল ধূম্রজাল। শোনা যাচ্ছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আবহে এবার হয়তো বাংলার দর্শক প্রেক্ষাগৃহে বসে দেখতে পাবেন এই চর্চিত সিনেমাটি।
বিবেক অগ্নিহোত্রীর অভিযোগ ও প্রতিকূলতা
সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও প্রচারের শুরু থেকেই বিবেক অগ্নিহোত্রী বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন। পরিচালকের দাবি ছিল, রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে সাধারণ মানুষ ছবিটি দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে পুলিশি এফআইআর এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতা তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। এমনকি, রাজ্যপালের কাছ থেকে পুরস্কার নিতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। বিবেক অগ্নিহোত্রীর মতে, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ কেবল ছবি মুক্তিকেই আটকায়নি, বরং ছবিতে যুক্ত থাকা বাংলার শিল্পীদের ক্যারিয়ারের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন সম্ভাবনা
বিজেপির জয় এবং রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিবেক অগ্নিহোত্রী সরব হন। তিনি দাবি করেন, এর আগে যেভাবে ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ ছবিটিকেও বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে এই ছবির ক্ষেত্রেও। এখন নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কলকাতার একাধিক সিনেমা হল মালিক এবং ডিস্ট্রিবিউটাররা ছবিটি প্রদর্শনের ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটি কেবল একটি সিনেমার মুক্তি নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এক নতুন পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বাংলার দর্শকদের আগ্রহ
সিনেমাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল তুঙ্গে। অভিনেতা সৌরভ দাসের মতো অনেকেই অতীতে আক্ষেপ করেছিলেন যে, বাংলার ওপর তৈরি একটি সিনেমা কেন বাংলার মানুষ দেখতে পাবেন না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ছবির সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের পরিবারকেও ছবি দেখার জন্য ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হয়েছিল। এখন যখন ছবিটি পুনরায় মুক্তির তোড়জোড় শুরু হয়েছে, তখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের প্রেক্ষাগৃহে এটি কতটা সাড়া ফেলে, তা দেখার অপেক্ষায় সিনেপ্রেমীরা।
একটি চলচ্চিত্র যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে, তখন তা সমাজের এক গভীর বাস্তবতাকে তুলে ধরে। শিল্প ও রাজনীতির এই দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত জয় হয় সাধারণ দর্শকের কৌতূহলের। ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’-এর এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়তো আগামী দিনে বাংলা সিনেমার প্রেক্ষাগৃহে এক নতুন ধারার সূচনা করবে, যেখানে সব ধরনের সৃষ্টি কোনো বাধা ছাড়াই দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারবে। শিল্পের স্বাধীনতাই কোনো সংস্কৃতির প্রাণশক্তি, আর সেই শক্তির জয়গান গাওয়ার সময় এসেছে বলেই মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা।