বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রতি এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি অনেক মানুষের ব্যক্তিগত শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চন্দ্রনাথ রথ কেবল একজন দক্ষ কর্মী বা আপ্তসহায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন অনেকের কাছে এক নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং অত্যন্ত অমায়িক একজন মানুষ। নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে রাজ্যে যে অস্থিরতার চিত্র ফুটে উঠছে, এই ঘটনা যেন সেই আতঙ্ককে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ভেঙে পড়া মন
অভিনেত্রী মাফিন, যিনি একসময় বিজেপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, চন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবরে শোকে বিহ্বল। তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ঘটনার ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি চন্দ্রনাথকে একটি মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মেসেজটি আর ব্লু-টিক হয়নি, অর্থাৎ চন্দ্রনাথ তা দেখার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। মাফিনের কথায়, এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন একজন প্রাণবন্ত মানুষের চলে যাওয়া মেনে নেওয়া অসম্ভব। তিনি চন্দ্রনাথকে একজন মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার অকাল প্রয়াণ অনেকের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
সহকর্মীদের স্মৃতিতে চন্দ্রনাথ
চন্দ্রনাথ রথ যে সবার কাছে কতটা প্রিয় ছিলেন, তা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট। লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মতো নেত্রীরা জানিয়েছেন, শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চন্দ্রনাথ ছিলেন অন্যতম মাধ্যম। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী এবং দায়িত্ববান। বিজেপির মাইনরিটি মোর্চার রাজ্য সভাপতি কাসেম আলি জানিয়েছেন, মৃত্যুর কিছু সময় আগেও চন্দ্রনাথ তাকে নিজাম প্যালেসে আড্ডা দেওয়ার জন্য ডেকেছিলেন। চা আর আড্ডার সেই আমন্ত্রণ যে শেষ আমন্ত্রণ হয়ে থাকবে, তা হয়তো কাসেম আলি নিজেও কল্পনা করতে পারেননি।
ঘটনার ভয়াবহ সাক্ষী
এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা আরও প্রকট হয়েছে শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের বয়ানে। ঘটনার সময় তিনি চন্দ্রনাথের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান এবং রাজনৈতিক ব্যস্ততা নিয়ে আলোচনার মাঝপথেই হঠাৎ ফোনের অপর প্রান্তে গুলির শব্দ এবং কয়েকজনের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। এরপরই সব চুপ হয়ে যায়। ফোনের ওপারে থাকা বিধায়ক বুঝতে পারেন, চোখের পলকে কী এক বীভৎস ঘটনা ঘটে গেল। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক কালো অধ্যায়ের সংযোজন করল। ক্ষমতার লড়াইয়ে যখন প্রাণ দিতে হয় সাধারণ কর্মীদের, তখন তা পুরো সমাজকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। যে মানুষটি হাসিমুখে বন্ধুদের চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, আজ সেই মানুষটির অনুপস্থিতি এক শূন্যতা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার খাতিরে এই ধরনের নৃশংসতার প্রতিবাদ করা এখন সময়ের দাবি। চন্দ্রনাথের মতো একজন অমায়িক মানুষ, যিনি সবসময় অন্যদের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকতেন, তার এই অকাল প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের নিরাপত্তা আজ কতটা অনিশ্চিত। তার পরিবার এবং প্রিয়জনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে না হয়।