Headlines

টলিউডের অন্দরমহলে ক্ষমতার লড়াই: ব্যান কালচার ও বিতর্কের উত্তাল জলছবি

টলিউডের অন্দরমহলে ক্ষমতার লড়াই: ব্যান কালচার ও বিতর্কের উত্তাল জলছবি Photo by Ron Lach on Pexels

পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র জগৎ বা টলিউড দীর্ঘকাল ধরেই সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল থেকে উঠে আসা বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্ক এক ভিন্নধর্মী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ‘ব্যান কালচার’ বা শিল্পীদের কাজ থেকে বঞ্চিত করার যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা নিয়ে শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে স্বরূপ বিশ্বাসের নাম, যাঁর প্রভাব ও ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন টলিউডের একাধিক পরিচিত মুখ।

পাপিয়া অধিকারী ও রুদ্রনীল ঘোষের নিশানায় স্বরূপ বিশ্বাস

অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর্স গিল্ডে স্বরূপ বিশ্বাসের একাধিপত্য ছিল। তাঁর মতে, যোগ্যতার চেয়েও রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাই ছিল কাজের প্রধান মাপকাঠি। পাপিয়া অধিকারীর ভাষায়, ‘কফিনে শুতে দেব না বাংলা ছবিকে’—এই সংকল্প নিয়ে তিনি পরিস্থিতির পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে তাঁকে অঘোষিতভাবে ব্যান করা হয়েছিল। তাঁর মতে, টলিউডে এখন কেবল তারাই কাজ পাওয়ার যোগ্য, যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার ভুল ও অন্যায় দেখেও চুপ থাকেন।

ফেডারেশনের অবস্থান ও স্বরূপ বিশ্বাসের সাফাই

এই সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস অ্য়ান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, টলিউডে মনোপলি বা একাধিপত্য বলে কিছু নেই। তাঁর দাবি, সমস্ত সিদ্ধান্ত গিল্ডের সদস্যদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতেই নেওয়া হয়। তবে তাঁর এই যুক্তিকে যথেষ্ট মনে করছেন না ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই। বিশেষ করে দেব ও স্বরূপ বিশ্বাসের মধ্যে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নিয়ে যে সংঘাত প্রকাশ্যে এসেছিল, তা টলিউডের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর দুর্বলতাকেই বারবার সামনে নিয়ে আসছে।

ব্যান কালচার ও শিল্পী স্বাধীনতার সংকট

টলিউডের এই বিতর্ক কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। যখন কোনো ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের সুযোগ যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তখন শিল্পের মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অভিনেতা দেবের সাম্প্রতিক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, যেখানে তিনি বিভাজনের সংস্কৃতি অতীত হওয়ার কথা বলেছেন, তা ইঙ্গিত দেয় যে ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে পরিবর্তনের একটি প্রবল হাওয়া বইছে। ৮০ শতাংশের বেশি টেকনিশিয়ান ও কলাকুশলী কাজ হারিয়ে যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষ কর্মপরিবেশ।

শিল্পের আঙিনা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। টলিউডের এই বিতর্কিত সময়টি শেষ পর্যন্ত একটি শুদ্ধিকরণের সুযোগ নিয়ে আসতে পারে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে এটি স্পষ্ট যে, শিল্পী ও কলাকুশলীরা এখন আর নীরব থাকতে রাজি নন। সৃজনশীলতার বিকাশের জন্য প্রয়োজন ভয়হীন পরিবেশ, যেখানে মেধা ও পরিশ্রমই হবে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি। টলিউডের এই অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে দিনের আলোয় ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রির সাথে যুক্ত হাজারো মানুষ, যারা স্বপ্ন দেখেন এক স্বচ্ছ ও সমৃদ্ধ বাংলা চলচ্চিত্রের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *