পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক পালাবদল কেবল ক্ষমতার অদলবদল নয়, বরং এটি রাজ্যের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায়, যাকে কেন্দ্র করে বাংলার সংস্কৃতি ও বিনোদন জগত আবর্তিত হয়, সেখানেও এখন পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি যখন রাজ্যে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই টলিউডের শিল্পী, কলাকুশলী এবং সাধারণ কর্মীরা এক নতুন আশার আলো দেখছেন। রাজনীতির এই হাওয়া যে বিনোদন জগতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, তা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়।
পাপিয়া অধিকারীর নিশানায় ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’
টালিগঞ্জের এই পরিবর্তনের লড়াইয়ে অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন অভিনেত্রী ও বিজেপি নেত্রী পাপিয়া অধিকারী। অরূপ বিশ্বাসকে পরাজিত করে তিনি যে জয় তুলে নিয়েছেন, তা স্টুডিওপাড়ার সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তন এনেছে। জয়ের পর থেকেই তিনি টলিউডের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থা এবং বিশেষ করে ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’ অর্থাৎ অরূপ বিশ্বাস ও স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। পাপিয়া অধিকারীর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে স্টুডিওপাড়ায় যে ‘ব্যান সংস্কৃতি’ এবং স্বজনপোষণ চলেছে, তা বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সিনে টেকনিশিয়ানদের ক্ষোভ ও নতুন প্রত্যাশা
ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই স্টুডিওপাড়ার একাংশের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ছিল। পাপিয়া অধিকারীর দাবি, যোগ্যতার চেয়েও রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতেই সেখানে কাজ দেওয়া হতো। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, অনেকে শুধুমাত্র ভাইয়ের জোরে উচ্চপদ দখল করে বসে ছিলেন এবং সাধারণ কর্মীদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছেন। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে শিল্পীরা এখন একটি মুক্ত পরিবেশের স্বপ্ন দেখছেন, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে।
বাংলা সিনেমার পুনর্জাগরণের ডাক
পাপিয়া অধিকারী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন, “আমরা কফিনে শুতে দেব না বাংলা ছবিকে।” তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, টলিউডের বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন প্রাণ সঞ্চারের জন্য তিনি বদ্ধপরিকর। তিনি মনে করেন, বাংলা সিনেমা আজ সংকটের মুখে, কারণ পেশাদারিত্বের অভাব এবং রাজনীতির হস্তক্ষেপ শিল্পকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বিজেপির নতুন সরকারের কাছে শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাঁরা চাইছেন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের পা চাটা লোক নয়, বরং প্রকৃত প্রতিভারা কাজ করার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে, টলিউডের প্রখ্যাত অভিনেতা জিৎ তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ডাক দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মোদির গ্যারান্টি এবং নতুন সরকারের ওপর তাঁর আস্থা রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলার সংস্কৃতি ও শিক্ষাকে যেভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পেতে এবং আবারও ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি আশাবাদী। জিতের এই বার্তা কেবল একজন অভিনেতার নয়, বরং বাংলার সেই সমস্ত মানুষের প্রতিনিধি, যারা দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলিত বোধ করেছেন এবং এখন পরিবর্তনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
টালিগঞ্জের এই পরিবর্তনের লড়াই শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি বাংলার সৃজনশীলতাকে মুক্ত করার লড়াই। যখন কোনো শিল্পমাধ্যম রাজনৈতিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। অরূপ বিশ্বাস বা স্বরূপ বিশ্বাসের মতো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এখন দেখার বিষয় হলো, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে টলিউড কতটা দ্রুত তার হারানো জৌলুস ফিরে পেতে পারে এবং শিল্পী ও কলাকুশলীরা কতটা স্বাধীনভাবে তাদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করার সুযোগ পান। শিল্পের জয় সুনিশ্চিত করতে হলে রাজনীতির বেড়াজাল থেকে টালিগঞ্জকে মুক্ত করা আজ সময়ের দাবি, আর সেই যাত্রাপথেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা বাংলা।