সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে এক গুরুত্বপূর্ণ পালাবদলের সাক্ষী হয়েছে রাজ্য। নতুন বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি ছিল এক বিরাট আয়োজন, যেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ব্রিগেড ময়দানে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন এক পরিচিত মুখ, মধুমন্তী মৈত্র। দীর্ঘ দুই-তিন দশক ধরে কলকাতা দূরদর্শনে সংবাদপাঠিকা হিসেবে যাঁর কণ্ঠস্বর বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছেছে, সেই মধুমন্তী মৈত্র হঠাৎ করেই যেন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। তবে এই আকস্মিক পরিচিতি তাঁকে বিস্মিত এবং অভিভূত করেছে, যা তাঁর নিজের কথায়ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিনের সাধনা, অবশেষে স্বীকৃতি
মধুমন্তী মৈত্রর অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়া সত্যিই ভাবার মতো। তিনি নিজেই বলেছেন, “আমি অভিভূত তো বটেই। আমি অবাকও।” তাঁর এই বিস্ময়ের কারণ হলো, এত বছর ধরে হাজার হাজার কর্পোরেট, সাংস্কৃতিক, সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করার পরেও তিনি নাকি কখনও এমন ব্যাপক স্বীকৃতি পাননি। সংবাদপত্রে বা গণমাধ্যমে তাঁর নাম উল্লেখ করা হতো না বললেই চলে। তাঁর কথায়, “আমি হয়ত বুঝতেই পারতাম না, মানুষ আমার কাজ নিয়ে কী ভাবে, যদি না সমাজমাধ্যম থাকত।” এই উক্তিটি বর্তমান সময়ে সমাজমাধ্যমের গুরুত্বকে তুলে ধরে। যেখানে মূলধারার গণমাধ্যম অনেক সময় পেশাদারদের কাজকে উপেক্ষা করে, সেখানে সমাজমাধ্যম সাধারণ মানুষের মতামতকে সামনে এনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। মধুমন্তী মৈত্রর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এই অনুষ্ঠানের পর সমাজমাধ্যমে তাঁর সঞ্চালনার ভূয়সী প্রশংসা শুরু হতেই তিনি প্রথম বুঝতে পারেন, মানুষ তাঁকে কতটা ভালোবাসে এবং তাঁর কাজকে কতটা সম্মান করে।
গণমাধ্যম বনাম সমাজমাধ্যম: এক নতুন সমীকরণ
সঞ্চালিকা হিসেবে মধুমন্তী মৈত্রর যাত্রা সুদীর্ঘ। দূরদর্শনের দিনগুলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা তাঁকে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দিয়েছে। অথচ, আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “হাজার হাজার অনুষ্ঠান করেছি। সঞ্চালিকার নামের উল্লেখ পর্যন্ত কেউ করেন না। খবরের কাগজে আমি আমার নাম কোনওদিন প্রিন্টেড অক্ষরে দেখিনি।” এমনকি এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে যে, একটি অনুষ্ঠানের কভারেজে সহ-সঞ্চালিকার নাম উল্লেখ করা হলেও তাঁর নাম বাদ পড়ে গেছে। এই ধরনের অভিজ্ঞতা যেকোনো পেশাদারের জন্যই হতাশাজনক। কিন্তু সমাজমাধ্যম এই পুরনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। যেখানে মূলধারার গণমাধ্যম একজন সঞ্চালিকার কাজকে আলাদা করে তুলে ধরতে নারাজ ছিল, সেখানে সমাজমাধ্যম সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে এক নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে। তাঁর কণ্ঠস্বর ক্যামেরায় দেখা না গেলেও, শুধু গলা শুনেই মানুষ তাঁকে চিনে নিয়েছেন এবং তাঁর প্রশংসা করেছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রকৃত মেধা ও নিষ্ঠা কখনও চাপা থাকে না, তা একদিন না একদিন তার প্রাপ্য সম্মান অর্জন করেই নেয়।
রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের অঙ্গীকার
এই অপ্রত্যাশিত আলোচনার মুখে মধুমন্তী মৈত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পষ্টীকরণ দিয়েছেন। তিনি চান না কেউ এমনটা ভাবুক যে তিনি “আগের সরকারের কাছের লোক ছিলেন না, এই সরকারের কাছের লোক।” তাঁর কথায়, এমন ভাবনা ভিত্তিহীন। কারণ তিনি রাজ্য সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার দফতর থেকেই ফোন পেয়েছেন, যা একটি স্বাভাবিক সরকারি প্রক্রিয়া। এর আগেও তিনি একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেছেন, কিন্তু কখনও তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়নি। তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী হয়তো তাঁকে নামে না চিনলেও, তাঁর কাজ সম্পর্কে অবগত। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর তাঁর কাজ ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবগত বলেই তাঁকে এই বিরাট মাপের অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়েছে। বিশেষত, যেখানে অনুষ্ঠানের বেশিরভাগ অংশই তাঁকে একেবারে কোনও স্ক্রিপ্ট ছাড়াই সঞ্চালনা করতে হয়েছে, সেখানে তাঁর দক্ষতা ও বিভিন্ন ভাষায় সাবলীলতা অনস্বীকার্য। এই ঘটনা তাঁর পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
আগের সরকারের প্রতি তাঁর কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ না থাকলেও, তিনি জানিয়েছেন যে ২০১১ সাল থেকে তিনি আর রাজ্য সরকারের ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সঞ্চালনা করার ডাক পান না। তবে এ বিষয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ তাঁর মতে, ২০১০ সালের পর থেকে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ধরন অনেকটাই বদলে গেছে, যা তাঁর কাজের ধরনের সঙ্গে মানানসই নয়। “ওটা আমার জন্য নয়,” তাঁর এই কথায় পেশাদারিত্বের প্রতি তাঁর স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। একইসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “সরকারি খরচে এত ভুরি ভুরি অনুষ্ঠান করা কি এমন ঋণন্যুব্জ রাজ্যের মানায়?” এই প্রশ্নটি অর্থনৈতিক দিক থেকে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি তাঁর সচেতনতাকেও প্রকাশ করে।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
নতুন সরকারের শপথগ্রহণে উপস্থিত থাকার পর মধুমন্তী মৈত্রর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, নতুন দল ও সরকারের কাছে তাঁর কী প্রত্যাশা? তাঁর উত্তর ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং আশাবাদী। তিনি বলেছেন, “চেঞ্জ ইজ দ্য অনলি কনস্ট্যান্ট।” অর্থাৎ, পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুবক, এবং এই পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নিতে হবে। একইসঙ্গে তিনি সুশাসন, শৃঙ্খলাবোধ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাংলাকে আবার সারা বিশ্বের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হবে। এই প্রত্যাশা কেবল একজন পেশাদার সঞ্চালিকার নয়, বরং একজন সচেতন নাগরিকেরও। তিনি চান, রাজ্য নতুন দিশা পাক, যেখানে মেধা ও পেশাদারিত্বকে যথার্থ মূল্যায়ন করা হবে এবং যেখানে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নতুন করে বিশ্ব মঞ্চে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
মধুমন্তী মৈত্রর এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিছক পরিচিতির জন্য কাজ না করে, নীরবে নিজের কাজ করে যাওয়া একজন প্রকৃত শিল্পীর সবচেয়ে বড় গুণ। যখন সমাজমাধ্যম লক্ষ লক্ষ মানুষের কণ্ঠস্বরকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে, তখন দীর্ঘদিনের অবহেলিত প্রতিভাও তার প্রাপ্য সম্মান লাভ করে। তাঁর এই প্রাপ্তি কেবল তাঁর একার নয়, বরং সেই সমস্ত পেশাদারদের জন্য এক অনুপ্রেরণা, যাঁরা দিনের পর দিন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন, কিন্তু মূলধারার আলোকবর্তিকা থেকে দূরে। তাঁর কণ্ঠস্বর যেমন বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী, তেমনই তাঁর এই বর্তমান অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, ভালো কাজের স্বীকৃতি একদিন না একদিন আসবেই, হয়তো অপ্রত্যাশিত ভাবেই, কিন্তু আসবেই।