বৃহস্পতিবার কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) শান্তনু সিন্হা বিশ্বাসকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেফতার করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। বেহালার ব্যবসায়ী জয় এস কামদারের সঙ্গে জড়িত ‘সোনা পাপ্পু’ সংক্রান্ত তোলাবাজি ও প্রতারণা মামলায় তথ্য গোপন এবং তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগে ইডি দফতরে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা জেরার পর এই উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রেক্ষাপট: ‘সোনা পাপ্পু’ মামলা ও সিন্ডিকেটের জাল
এই গ্রেফতারি রাজ্যের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনেছে। ইডি সূত্রে জানা গেছে, ‘সোনা পাপ্পু’ মামলাটি মূলত তোলাবাজি এবং প্রতারণার একটি বৃহত্তর চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে ভুয়ো এফআইআর দায়ের করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে বেহালার ব্যবসায়ী জয় এস কামদারের নাম উঠে আসে, যাকে ইডি ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে। কামদারের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরি এবং নথিপত্রেই প্রথম শান্তনু সিন্হা বিশ্বাসের নাম সামনে আসে, যা ইডি’র তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তদন্তকারীদের দাবি, শান্তনু সিন্হা বিশ্বাস এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ কার্যকলাপে মদত দিতেন।
জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রমাণের বিবরণ
ইডি আধিকারিকরা শান্তনু সিন্হা বিশ্বাসকে একাধিকবার নোটিস পাঠিয়েছিলেন। এর আগে পাঁচবার নোটিস পাঠানো হলেও তিনি হাজিরা এড়িয়ে যান। এমনকি, তার বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিস জারির প্রস্তুতিও নিয়েছিল ইডি। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ইডি দফতরে হাজিরা দেন। সেখানে সকাল ১১টা ৫ মিনিট থেকে শুরু হওয়া জেরা চলে রাত পর্যন্ত, প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা ধরে। ইডি সূত্রে খবর, জেরার প্রথম দিকে শান্তনু সিন্হা বিশ্বাস কিছুটা সহযোগিতা করলেও, পরে যখন তাকে জয় এস কামদারের ফোন থেকে পাওয়া হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট এবং অন্যান্য নথি দেখানো হয়, তখন তিনি অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান এবং তথ্য গোপন করার চেষ্টা করেন। তদন্তকারীরা দাবি করেছেন যে, ডিসি একাধিকবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন এবং অনেক নথি সম্পর্কে ‘কিছুই জানি না’ বলে দাবি করেছেন।
শান্তনু সিন্হা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলায় ইডি নোটিস পাঠিয়েছিল— ‘সোনা পাপ্পু’র তোলাবাজি ও প্রতারণা মামলা, এনআরআই কোটায় মেডিক্যাল অ্যাডমিশন সংক্রান্ত মামলা এবং বালি পাচারের মামলা। যদিও তাকে ‘সোনা পাপ্পু’ মামলাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে। ইডি’র তদন্তে উঠে এসেছে যে, শান্তনু সিন্হা বিশ্বাস একটি ‘নেক্সাস’ বা সিন্ডিকেট চালাতেন, যেখানে জয় এস কামদারের মতো ব্যবসায়ীরা তার মদতে বিভিন্ন জায়গায় জমি দখল করতেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় যাদের জমি ছিল, তাদের নামে ভুয়ো এফআইআর দায়ের করে থানায় ডেকে চাপ সৃষ্টি করা হতো এবং পরে সেই জমি দখল করা হতো। এই অবৈধ কার্যকলাপে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছে বলেও ইডি দাবি করেছে। ইডি’র দাবি অনুযায়ী, কলকাতা পুলিশের অন্তত ১২ জন আধিকারিকের নাম এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা এই মামলার গভীরতা এবং ব্যাপ্তি নির্দেশ করে।
তদন্তকারীরা জয় এস কামদারের মোবাইল ফোন থেকে প্রাপ্ত হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। এই চ্যাটগুলিতে ভুয়ো এফআইআর নম্বর আদান-প্রদানের প্রমাণ মিলেছে, যা শান্তনু সিন্হা বিশ্বাসের জড়িত থাকার অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। বেআইনিভাবে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও তথ্যের বিশ্লেষণ
এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের কার্যপদ্ধতি ছিল সুপরিকল্পিত। উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকের প্রভাবকে ব্যবহার করে বেআইনিভাবে জমি দখল এবং আর্থিক লেনদেন একটি গুরুতর অপরাধ। ইডি’র দাবি, কলকাতা পুলিশের অন্তত ১২ জন আধিকারিকের এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি আরও গভীর তদন্তের দাবি রাখে। এই সংখ্যাটি ইঙ্গিত দেয় যে, দুর্নীতির শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত থাকতে পারে। এই ধরণের সিন্ডিকেটগুলি সাধারণত রাজনৈতিক মদত এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কাজ করে, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
প্রভাব ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
কলকাতা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিকের গ্রেফতারি কেবল ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, এটি সমগ্র আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থার উপর গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। এই ঘটনা জনমানসে পুলিশের সততা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। এর ফলে কলকাতা পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই গ্রেফতারি রাজ্যের অন্যান্য দুর্নীতি মামলার তদন্তেও নতুন গতি আনতে পারে এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বার্তা দিতে পারে যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ইডি এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি রাজ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের গতি আরও বাড়াতে চলেছে। এই ঘটনা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করবে।
আগামীকাল শান্তনু সিন্হা বিশ্বাসকে আদালতে পেশ করা হবে, যেখানে ইডি তাকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে। ইডি’র উদ্দেশ্য হবে তাকে আরও জেরা করে এই সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্য এবং তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটন করা। এই মামলার গতিপ্রকৃতি আগামী দিনে রাজ্যের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক মহলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। আরও বেশ কিছু আধিকারিকের নাম সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মামলার রায় এবং পরবর্তী তদন্তের ফলাফল রাজ্যের দুর্নীতি দমনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এটি শুধু একটি গ্রেফতারি নয়, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর লড়াইয়ের সূচনা হতে পারে।