গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামক মার্কিন সামরিক অভিযানে ইরানকে লক্ষ্য করে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে আমেরিকা। মাত্র দুই মাসের এই যুদ্ধে ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ হয়েছে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে প্রবল চাপে ফেলেছে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই ব্যয় এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং সামরিক ব্যয় বনাম জনকল্যাণের বিতর্ক মাথাচাড়া দিচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক যুদ্ধের ব্যয়
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন নয়। এই উত্তেজনা প্রায়শই বিভিন্ন সামরিক কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে সাম্প্রতিক ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে আধুনিক যুদ্ধের এক নতুন এবং ব্যয়বহুল দিক উন্মোচিত হয়েছে। এই অভিযানটি শুধুমাত্র সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শনী ছিল না, এটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের আকাশছোঁয়া খরচের এক স্পষ্ট উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের দিনে যুদ্ধ মানে শুধু সেনাবিন্যাস বা অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার নয়, বরং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির গবেষণা, উন্নয়ন এবং প্রয়োগে বিপুল বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের ফলে যুদ্ধ যেমন আরও নির্ভুল ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে, তেমনই এর অর্থনৈতিক ব্যয়ও কল্পনাতীত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরান অভিযানের আর্থিক হিসাব আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আকাশছোঁয়া আর্থিক ব্যয়: সংখ্যায় এক ঝলক
পেন্টাগন থেকে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে আমেরিকার মোট ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভারতীয় মুদ্রায় এই পরিমাণ প্রায় ২.৩ লক্ষ কোটি টাকার সমান। এই অঙ্ক কতটা বিশাল তা কয়েকটি তুলনার মাধ্যমে সহজে বোঝা যায়।
উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এক বছরের মোট বাজেট প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র দুই মাসের একটি সামরিক অভিযানে নাসা এক বছরে মহাকাশ গবেষণায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, আমেরিকা তার সমপরিমাণ অর্থ খরচ করেছে। শুধু তাই নয়, এই ব্যয় ভারতের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তিগুলির মধ্যে একটি।
মানবিক সহায়তার সুযোগ ও হারানো সম্ভাবনা
এই বিপুল অর্থ যদি জনকল্যাণে ব্যয় করা যেত, তবে তার প্রভাব হতো সুদূরপ্রসারী। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২৫ বিলিয়ন ডলারের এই বাজেট দিয়ে ওমান, পানামা বা জর্জিয়ার মতো ছোট দেশের মোট জনসংখ্যা, অর্থাৎ প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষকে টানা ১০ বছর ধরে পেট ভরে খাওয়ানো যেত। এই তুলনাটি যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ের মানবিক সুযোগ ব্যয়ের এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থ দিয়ে আমেরিকার লক্ষ লক্ষ পরিবারের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা বা শিশু পরিচর্যা (Childcare) সহায়তা নিশ্চিত করা যেত। এমন বিনিয়োগ সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করত, যা সামরিক ব্যয় প্রায়শই করে না।
প্রতি মিনিটে ১৩ লক্ষ ডলার: যুদ্ধের দ্রুতগতির ব্যয়
আমেরিকা-ইরান সংঘাতে ব্যয়ের গতি ছিল অবিশ্বাস্য। বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে আমেরিকার দৈনিক খরচ ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। আরও সূক্ষ্মভাবে দেখলে, যুদ্ধের ময়দানে প্রতি মিনিটে খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ লক্ষ ডলার। এই পরিসংখ্যান আধুনিক যুদ্ধের দ্রুতগতি এবং ব্যাপক ব্যয়ের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
অভিযানের প্রথম সপ্তাহেই আমেরিকা ১১.৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। অত্যাধুনিক মিসাইল ও গোলাবারুদের ব্যাপক ব্যবহার এবং উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জামের দ্রুত মোতায়েন এই প্রাথমিক ব্যয়ের প্রধান কারণ ছিল। প্রতিটি ‘প্রিসিশন গাইডেড’ মিসাইল ও উন্নত প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জামের আকাশছোঁয়া দাম এই খরচের সিংহভাগ পূরণ করেছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
ইরান যুদ্ধের আর্থিক প্রভাব শুধুমাত্র আমেরিকার সামরিক বাজেটেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি বিশ্ব অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। ৫০ দিনের এই সংঘাতের ফলে বিশ্ব তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। অপরিশোধিত তেলের বাজারে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেলের দামের অস্থিরতা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং মুদ্রাস্ফীতির উপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে।
এই বিপুল সামরিক ব্যয় এবং এর অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা বাজেট এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের ব্যয়বহুল অভিযানগুলি ভবিষ্যতে আরও সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করা হবে বলে আশা করা যায়, যেখানে সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থায়িত্বকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অর্থনীতির বিশ্লেষকরা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন যে, এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাপী শক্তিগুলো কীভাবে তাদের সামরিক ব্যয় এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করে। আগামী দিনগুলিতে সামরিক প্রযুক্তির ব্যয় এবং এর মানবিক মূল্য নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।