কলকাতার চিংড়িঘাটা বাইপাসে মেট্রো প্রকল্পের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অবশিষ্ট কাজ আজ, শুক্রবার, রাত ৮টা থেকে শুরু হতে চলেছে। মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় দেড় বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে ৩১৭, ৩১৮ এবং ৩১৯ নম্বর পিলারের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ দুটি গার্ডার বসানোর জন্য দু’দফায় যান নিয়ন্ত্রণ করা হবে। প্রথম দফায় আজ রাত ৮টা থেকে ১৮ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় ২২ মে রাত ৮টা থেকে ২৫ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত এই যান নিয়ন্ত্রণ জারি থাকবে, যা লক্ষ লক্ষ যাত্রীর জন্য নিউ গড়িয়া-বিমানবন্দর অরেঞ্জ লাইন প্রকল্পের একটি বড় ধাপ।
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ও প্রেক্ষাপট
নিউ গড়িয়া থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রস্তাবিত অরেঞ্জ লাইন মেট্রো প্রকল্প কলকাতার পরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পটি শহরের দক্ষিণ প্রান্তকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে যুক্ত করবে, যা দৈনিক যাত্রীদের জন্য সময় ও যানজট উভয়ই সাশ্রয় করবে। তবে, চিংড়িঘাটা বাইপাসের ওপর তিনটি পিলারের মাঝে দুটি গার্ডার বসানোর কাজটি গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে ছিল।
প্রয়োজনীয় ট্র্যাফিক ব্লকের জন্য রাজ্য সরকার ও কলকাতা পুলিশের অনুমতি না মেলায় এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি থমকে ছিল। মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ করলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কারণে কাজটি এগোয়নি। এমনকি আদালতও দুই পক্ষকে বসে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দিয়েছিল, কারণ এই সামান্য অংশের কাজ সম্পন্ন হলে অসংখ্য মানুষের উপকার হবে। তবে, সেই রাজনৈতিক জটিলতা দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটিকে আটকে রেখেছিল।
কাজের বিস্তারিত ও যান নিয়ন্ত্রণ
শুক্রবার রাত ৮টা থেকে শুরু হওয়া এই কাজে বাইপাসের ওপরে ৩১৭, ৩১৮ এবং ৩১৯ নম্বর পিলারের মধ্যে দুটি গার্ডার স্থাপন করা হবে। এই কাজ সম্পন্ন করার জন্য একটি ‘ট্র্যাফিক ব্লক’ অপরিহার্য ছিল, যা ছাড়া গার্ডার বসানো সম্ভব হচ্ছিল না। মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ অবশেষে রাজ্য সরকার ও কলকাতা পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি পেয়েছে, যার ফলে কাজটি শুরু করা যাচ্ছে।
প্রথম দফায়, আজ রাত ৮টা থেকে ১৮ মে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত উত্তরমুখী রাস্তার ওপরের অংশে কাজ চলবে। এই সময়ে মূল বাইপাসের উত্তরমুখী অংশ বন্ধ করে রাখা হবে। এর বিকল্প হিসেবে বাইপাসের পাশ দিয়ে একটি নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যেই চালু করে দেওয়া হয়েছে। উত্তরমুখী গাড়িগুলি এই নতুন রাস্তা দিয়ে চলাচল করবে। দক্ষিণমুখী গাড়ির ক্ষেত্রে এই সপ্তাহে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না এবং তারা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করবে। দ্বিতীয় দফায়, ২২ মে রাত ৮টা থেকে ২৫ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত একই ধরনের যান নিয়ন্ত্রণ ও ডাইভারশন কার্যকর করা হবে বলে মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বিলম্বের প্রভাব ও সমাধান
চিংড়িঘাটার এই সামান্য অংশের কাজ আটকে থাকায় পুরো অরেঞ্জ লাইন প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছিল। এটি কেবল প্রকল্পের সময়সীমাকেই দীর্ঘায়িত করেনি, বরং নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অচলাবস্থা শহরের উন্নয়নের গতিকে মন্থর করে রেখেছিল। সংবাদ সূত্র অনুযায়ী, রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই কাজ অগ্রাধিকার পাচ্ছে এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসতেই এই দীর্ঘদিনের জট কাটানো সম্ভব হয়েছে। এই পদক্ষেপ প্রকল্পের দ্রুত সমাপ্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কলকাতা মেট্রো রেল কর্পোরেশন (KMRC) সূত্রে জানা গেছে, এই ধরনের বড় পরিকাঠামো প্রকল্পে রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা অপরিহার্য। অনুমতি প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় এখন বাকি কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে কেবল যাত্রী সুবিধা বাড়বে না, বরং পার্শ্ববর্তী এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গতি আসবে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও প্রত্যাশা
চিংড়িঘাটা মেট্রোর কাজ শুরু হওয়ায় অরেঞ্জ লাইন প্রকল্পের দ্রুত সমাপ্তির আশা জোরদার হয়েছে। এই অংশের কাজ শেষ হলে নিউ গড়িয়া থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা চালুর পথে আর বড় কোনো বাধা থাকবে না। এটি কলকাতার পূর্ব প্রান্তের সঙ্গে বিমানবন্দরের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে, যা শহরের যানজট কমাতে এবং ভ্রমণ সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে সাহায্য করবে।
বিশেষ করে, নিউ টাউন, রাজারহাট এবং সল্টলেকের মতো দ্রুত বর্ধনশীল এলাকার বাসিন্দারা এই মেট্রো পরিষেবা থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন। এই সংযোগ কর্মসংস্থান, আবাসন এবং বাণিজ্যিক কার্যকলাপে নতুন গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী দিনে এই প্রকল্পের অন্যান্য অংশের কাজ এবং সম্পূর্ণ অরেঞ্জ লাইন চালু হওয়ার দিকে নজর থাকবে, যা কলকাতার গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। কর্তৃপক্ষের নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয় এবং দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার উপরই নির্ভর করবে এই স্বপ্নের প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সাফল্য।