Headlines

শিল্পের স্বাধীনতা ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে সংস্কৃতি: শমীক ভট্টাচার্যের বার্তা

শিল্পের স্বাধীনতা ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে সংস্কৃতি: শমীক ভট্টাচার্যের বার্তা Photo by Mikhail Nilov on Pexels

সম্প্রতি আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে একটি নাটক দেখতে হাজির হয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জীবন নিয়ে তৈরি সেই নাটকে অভিনয় করেছেন ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিক, যিনি তৃণমূলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এই ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট কৌতূহল সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে গিয়ে শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। শমীক ভট্টাচার্য নিজেও এর আগে এবিপি আনন্দকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে তিনি একজন শিল্প অনুরাগী এবং ভোটযুদ্ধ মিটলেই তিনি থিয়েটার দেখতে যাবেন, এমনকি সেই থিয়েটারে যাঁরা অভিনয় করবেন, তাঁরা বিজেপির নন, এমনটাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন। এই পদক্ষেপটি পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শিল্পের স্বাধীনতা: এক মৌলিক অধিকার

নাটক দেখতে এসে শমীক ভট্টাচার্য যে মন্তব্য করেছেন, তা শিল্প ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘একজন শিল্পীর শিল্পকে খুন করার অধিকার কোনও রাজনৈতিক ব্য়ক্তিত্বের নেই, কোনও রাজনৈতিক সত্ত্বার নেই। মতপ্রকাশের অধিকার ভারতের সংবিধান তাঁকে দিয়েছেন।’ এই কথাগুলি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের কাজ প্রায়শই রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত বা সমালোচিত হয়। তাঁর মতে, নাটক নাটকের মতো চলবে এবং সরকারের সমালোচনা করার অধিকার শিল্পীদের রয়েছে। যদি কেউ সরকারের বিচ্যুতিকে তুলে ধরে নাটক, কবিতা বা প্রবন্ধ লিখতে চান এবং তাঁকে বাধা দেওয়া হয়, তবে ‘সেইদিনই এই দেশের, এই মাটির, এই সংস্কৃতির মৃত্যু নেমে আসবে।’

এই বক্তব্যটি একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। শিল্প কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজকে প্রশ্ন করার, সমালোচনা করার এবং নতুন চিন্তাভাবনা তুলে ধরার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। যখন এই স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়, তখন তা কেবল শিল্পীদের কণ্ঠরোধ করে না, বরং সমাজের সামগ্রিক প্রগতিকেও বাধাগ্রস্ত করে। শমীক ভট্টাচার্যের এই মন্তব্য একদিকে যেমন শিল্পীদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার বার্তা দেয়, তেমনি অন্যদিকে একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধকেও প্রকাশ করে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে শিল্প ও সংস্কৃতি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে, এবং এর বিকাশের জন্য একটি নির্ভীক ও স্বাধীন পরিবেশ অপরিহার্য।

গণতান্ত্রিক পরিসরের প্রসার ও টলিউড

শমীক ভট্টাচার্য কেবল শিল্পের স্বাধীনতার কথাই বলেননি, তিনি টলিউডের রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক পরিসরের প্রসার নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি এবিপি আনন্দে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুমন দে-কে বলেছিলেন যে ‘গণতান্ত্রিক পরিসর তো আরও বাড়ল।’ তিনি নিজে একজন থিয়েটারপ্রেমী হয়েও এক বছর ধরে থিয়েটার দেখতে পারেননি, এবং তিনি এমন শিল্পীদের কাজ দেখতে আগ্রহী ছিলেন যাঁরা ‘মানসিকভাবে বিজেপি-বিরোধী’। এই ধরনের মনোভাব সাংস্কৃতিক জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং শিল্পকর্মই প্রধান হয়ে ওঠে।

তাঁর মতে, ‘প্রত্যেকের কাজের পরিসর থাকবে।’ যারা ছোট ছোট পরিচালক, যারা ২০, ২৫, ৩০ লক্ষ টাকা জোগাড় করে একটি সিনেমা তৈরি করার স্বপ্ন দেখেন, তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ থাকা উচিত। ‘যেভাবে দখলদারি চলেছিল, সেটার থেকে মুক্তি তাঁদের দিতে হবে। তাঁদের সেই পরিসরটা দিতে হবে।’ এই কথাগুলি টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা। তিনি মনে করেন যে, শিল্পীদের কাজ করার জন্য একটি মুক্ত এবং নিরপেক্ষ পরিবেশ থাকা উচিত, যেখানে মেধা এবং সৃজনশীলতাই একমাত্র বিচার্য বিষয় হবে, রাজনৈতিক আনুগত্য নয়। এই ধরনের পরিবেশই শিল্পের প্রকৃত বিকাশে সাহায্য করতে পারে।

টলিউডের ‘দাদাগিরি’র অবসান?

টলিউডে একচেটিয়া ‘দাদাগিরি’র অবসান প্রসঙ্গে শমীক ভট্টাচার্য অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ‘একদম শেষ। ওটা চলতে দেব না।’ তাঁর মতে, ‘পুরো একচেটিয়া বিজেপির দখলদারি চলবে, আকাদেমিতে কে কবে স্লট পাবে.. চলবে না। নন্দনে কার ছবি রিলিজ করবে, কার ছবি রিলিজ করবে না..একটা পার্টি ঠিক করে দেবে.. এটা নয়।’ এই বক্তব্যটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দ্বারা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি চান যে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকুক এবং কোনও রাজনৈতিক দল যেন তাদের উপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার না করে।

এই মন্তব্যের মাধ্যমে শমীক ভট্টাচার্য ‘প্রতিভার মর্যাদা দিতে হবে’ এবং ‘মুক্তমনস্ক মানুষদের সামনে নিয়ে আসতে হবে’ বলে জোর দিয়েছেন। তাঁর এই আহ্বান টলিউডকে একটি আরও গণতান্ত্রিক ও সমতাপূর্ণ জায়গায় পরিণত করার দিকে ইঙ্গিত করে। যেখানে শিল্পীরা তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে কাজ করার সুযোগ পাবেন এবং তাঁদের মেধা ও সৃজনশীলতাই তাঁদের সাফল্যের মাপকাঠি হবে। সাংস্কৃতিক জগতে এই ধরনের পরিবর্তন কেবল শিল্পীদের জন্যই নয়, বরং দর্শকদের জন্যও নতুন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজের সুযোগ তৈরি করবে।

অহেতুক রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি

শমীক ভট্টাচার্য সমাজ এবং সমালোচকদের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন, ‘অহেতুক রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা থেকে দূরে আসুন। এতে কোনো লাভ হয় না।’ এই কথাগুলি বর্তমান সমাজে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন প্রায়শই ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং পেশাদারিত্বের উপর প্রভাব ফেলে। শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই ‘রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা’ শিল্পীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি চান যে, শিল্পীরা তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে একে অপরের কাজকে সম্মান করুন এবং সহযোগিতা করুন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে দূরে সরিয়ে রাখা বা বর্জন করা, কোনোভাবেই শিল্পের জন্য মঙ্গলজনক নয়। বরং, এটি শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশকে রুদ্ধ করে। শমীক ভট্টাচার্যের এই বার্তাটি সমাজে এক নতুন ঐক্যের আহ্বান জানায়, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি সকলেরই একটি অভিন্ন শ্রদ্ধা থাকবে। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই পারে বাংলাকে তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে।

একজন বিরোধী দলের নেতার পক্ষ থেকে তৃণমূল সাংসদের নাটকে উপস্থিতি এবং শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর সুদৃঢ় বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, শিল্পের নিজস্ব একটি ভাষা আছে যা সকল রাজনৈতিক বিভেদকে অতিক্রম করে। এই ঘটনাটি হয়তো ভবিষ্যতের জন্য একটি পথ খুলে দেবে, যেখানে শিল্পীরা নির্ভয়ে তাঁদের সৃষ্টিকে তুলে ধরতে পারবেন, এবং দর্শক ও সমালোচকরা রাজনৈতিক রঙ না দেখে শিল্পের গুণগত মানকে বিচার করবেন। শিল্প যখন তার নিজস্ব মহিমায় বিকশিত হয়, তখন তা কেবল শিল্পীদের নয়, সমগ্র সমাজের জন্যই এক উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *