Headlines

টলিউডে পালাবদল: শিল্পের মুক্তি ও নতুন দিগন্তের হাতছানি

টলিউডে পালাবদল: শিল্পের মুক্তি ও নতুন দিগন্তের হাতছানি Photo by DΛVΞ GΛRCIΛ on Pexels

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বিশাল পালাবদল প্রত্যক্ষ করার পর, টলিউডের অন্দরমহলেও পরিবর্তনের সুর বাজতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘লবিবাজি’ এবং ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ থেকে মুক্তি পাওয়ার এক নতুন আশা জেগে উঠেছে চলচ্চিত্র মহলে। সরকারি সিনেমা হল, বিশেষ করে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নন্দন, যেখানে একসময় নির্দিষ্ট কিছু ছবি বাদে অন্যদের প্রবেশাধিকার ছিল না বলে অভিযোগ উঠত, সেখানে এখন রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং রুদ্রনীল ঘোষ অভিনীত চলচ্চিত্রগুলিও প্রদর্শিত হচ্ছে। এই ঘটনাকেই অনেকে শিল্পের ভাষার ‘মুক্ত’ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।

নন্দনে শিল্পের নতুন ঠিকানা

সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এসআরএফটিআই-এর ছাত্র জয়ব্রত দাসের আলোচিত ছবি ‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ এবং সমর্পণ সেনগুপ্তর ‘প্রত্যাবর্তন’ ছবিগুলি নন্দনে জায়গা করে নিয়েছে। জয়ব্রত দাসের ছবিটি ২০২১ সালে তৈরি হলেও ফেডারেশনের নিয়মের বিরোধিতার কারণে এর মুক্তি আটকে ছিল এবং দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর মুক্তি পেলেও সরকারি হলে জায়গা পায়নি। সমর্পণ সেনগুপ্ত নিজেও বলছেন, ‘কখনও ভাবিনি নন্দনে আমাদের ছবি দেখানো হবে।’ এই ঘটনাগুলি টলিউড পাড়ায় এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে, যেখানে এখন মনে করা হচ্ছে, যোগ্যতার ভিত্তিতেই ছবিগুলি প্রদর্শিত হবে, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।

শিল্পীদের কণ্ঠে পরিবর্তনের সুর

‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ ছবিতে অভিনয় করেছেন রুদ্রনীল ঘোষ, রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌরভ দাস, ঋষভ বসু, পায়েল সরকার এবং সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের মতো তারকারা। শিবপুরের অভিনেতা ও বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘আগে সব নবান্নের নির্দেশেই হত। কাস্টিং থেকে রিলিজ সব হত। যোগ্যতা দেখা হত না। এখন যোগ্যতা অনুযায়ী হবে। যারা এসব করেছেন, এখন ঠিক হয়ে যান, মানুষ আপনাকে ঠিক করে দেবে।’ তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, টলিউডের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়ে আসছিল।

‘ব্যান’ রাজনীতি ও লবিবাজির অবসান?

অভিনেতা ঋষভ বসু অভিযোগ করেছেন যে, আরজি কর আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে কাস্টিং করা হত না। সোনারপুর দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ও একই সুরে কথা বলেছেন, ‘সিনিয়র লোকেদের পাত্তা দিত না। জুনিয়ররা ছড়ি ঘোরাত।’ সঙ্গীত শিল্পী ও অভিনেতা শিলাজিৎ মজুমদার এই রাজনৈতিক বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘পার্টি বুঝি না। আমি চাইব, এর মুখ ওর মুখ করিস না। সিনেমার হোর্ডিং থাকুক।’ এই বক্তব্যগুলি টলিউডের অন্দরমহলের এক অন্ধকার দিকের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে শিল্পের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই বেশি গুরুত্ব পেত।

‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’ এবং একাধিপত্যের অভিযোগ

তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় বারবার ‘ব্যান’ রাজনীতি, শিল্পী ও শিল্পের ওপর ‘শাসকের শাসন’ এবং ‘বিশ্বাস ব্রাদার্সের একাধিপত্য’-এর মতো মারাত্মক সব অভিযোগ উঠেছে। প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই এবং ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের ভূমিকা নিয়েও স্টুডিওপাড়ার একাংশ ক্ষুব্ধ ছিল। এবারের নির্বাচনে টালিগঞ্জ বিধানসভা আসনে বিজেপি প্রার্থী অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারীর কাছে তৃণমূল প্রার্থী ও প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের পরাজয় অনেকের কাছেই ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর প্রতি টালিগঞ্জের বিশ্বাস হারানোর ইঙ্গিত বহন করছে। এই পরিবর্তন কি সত্যিই ‘লবিবাজি’ খতম করবে এবং শিল্পের জন্য এক নতুন পথ খুলে দেবে, তা সময়ই বলবে।

টলিউডের এই নতুন অধ্যায় কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের স্বাধীনতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি শিল্পের সামগ্রিক পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এক সুস্থ প্রতিযোগিতার বাতাবরণ তৈরি হলে, বাংলা চলচ্চিত্র নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে। এই পরিবর্তন শিল্পী, কলাকুশলী এবং দর্শকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও গুণগত মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহিত করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *