Headlines

আফগানিস্তানে তালিবানের নতুন পারিবারিক আইন: বাল্যবিবাহের বৈধতা ও বিতর্ক

আফগানিস্তানে তালিবানের নতুন পারিবারিক আইন: বাল্যবিবাহের বৈধতা ও বিতর্ক Photo by Faruk Tokluoğlu on Pexels

সম্প্রতি আফগানিস্তানে তালিবান সরকার একটি নতুন ‘পারিবারিক আইন’ চালু করেছে, যা বাল্যবিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বিবাহ ও বিচ্ছেদ সংক্রান্ত নীতিমালায় বিতর্কিত পরিবর্তন এনেছে। তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লা আখুনজাদার অনুমোদনের পর এই আইন কার্যকর হয়েছে, যা মানবাধিকার কর্মী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই পদক্ষেপ আফগান নারীদের অধিকারের উপর তালিবানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের আরও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ সামাজিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রেক্ষাপট: তালিবান শাসনের অধীনে নারী অধিকার

২০২১ সালের আগস্ট মাসে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে তালিবান সরকার নারী ও মেয়েদের অধিকারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছে। মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নারীদের বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে এবং জনজীবনে তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই পদক্ষেপগুলি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছে, কিন্তু তালিবান তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যায় শরিয়া আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনড় রয়েছে। নতুন পারিবারিক আইনটি নারী অধিকারের এই ক্রমহ্রাসমান পরিস্থিতিরই একটি সম্প্রসারণ, যা আফগান সমাজের অর্ধেক অংশের জন্য আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিতর্কিত আইনের বিস্তারিত দিক

আমু টিভি (Amu TV) সূত্রে জানা গেছে, তালিবানের নতুন পারিবারিক আইনের বেশ কিছু অনুচ্ছেদ বিশেষ করে বিতর্কিত। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ৩১ নং অনুচ্ছেদ, যা বিবাহ এবং বিচ্ছেদ সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ করে। এই আইনের অধীনে, একজন কুমারী মেয়ে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর তার নীরবতাকে বিয়েতে সম্মতি হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে, পুরুষদের ক্ষেত্রে বা পূর্বে বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে এই নীরবতা সম্মতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে না, যা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

আইনের ৫ নং অনুচ্ছেদে ‘খিয়ার আল-বুলুঘ’ বা ‘বয়ঃসন্ধিকালের উপায়’ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এর ফলে বাল্যকালে কারো বিয়ে হয়ে থাকলে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তিনি বিয়ে বাতিলের আবেদন জানাতে পারবেন। তবে, এই বাতিল প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। যদি বাবা বা দাদু ব্যতীত অন্য কোনো আত্মীয় বাল্যকালে বিয়ে দিয়ে থাকেন এবং স্বামী সামাজিকভাবে উপযুক্ত হন ও পণ ঠিকঠাক হয়, তাহলে সেই বিয়ে বৈধ বলে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে বিয়ে বাতিল করতে হলে তালিবান আদালতের অনুমোদন নিতে হবে, যা ভুক্তভোগী মেয়েদের জন্য একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া হতে পারে।

বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাবা এবং দাদুর হাতেই প্রধান কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, যদি অভিভাবক অত্যাচারী হন বা নৈতিক মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ না হন, তবেই বিয়ে বাতিল হতে পারে। এছাড়াও, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ধর্মান্তরণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্বামী নিখোঁজ থাকলে, সে সব মামলায় তালিবান বিচারকদের প্রভূত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতাগুলি বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উপর আরও বেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া

এই নতুন আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা কুড়িয়েছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল (UNICEF) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি দীর্ঘদিন ধরে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আসছে, কারণ এটি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তাদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়। আফগানিস্তানে বাল্যবিবাহের আইনি বৈধতা শিশুদের মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আইন আফগানিস্তানের গ্রামীণ ও দরিদ্র অঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার আরও বাড়িয়ে তুলবে। অর্থনৈতিক সংকট এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা অনেক পরিবারকে তাদের মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য করে, যাতে তারা তাদের বোঝা কমাতে পারে। এই আইন সেই প্রবণতাকে আরও উৎসাহিত করবে এবং মেয়েদের দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (UN Human Rights Commission) এবং বিভিন্ন দেশ এই আইনের কড়া সমালোচনা করেছে। তারা আফগানিস্তানের তালিবান সরকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি এবং নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত কনভেনশন (CEDAW) মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে, যদিও তালিবান এই ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি মানতে নারাজ।

ভবিষ্যৎ প্রভাব এবং করণীয়

তালিবানের এই নতুন পারিবারিক আইন আফগানিস্তানের সামাজিক কাঠামো এবং নারী অধিকারের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি শুধু বাল্যবিবাহের হারই বাড়াবে না, বরং নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ আরও সীমিত করবে। এর ফলে আফগানিস্তানে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যার মধ্যে কূটনৈতিক চাপ, মানবিক সহায়তা এবং নারী অধিকারের পক্ষে জোরালো সমর্থন অন্তর্ভুক্ত।

ভবিষ্যতে এই আইনের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। এটি আফগানিস্তানের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মেয়েদের জীবনকে প্রভাবিত করবে এবং দেশটির সামগ্রিক মানবিক ও উন্নয়ন পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এবং বিভিন্ন দেশের সরকারগুলির উচিত তালিবানের উপর চাপ অব্যাহত রাখা, যাতে তারা তাদের নীতিগুলি পুনর্বিবেচনা করে এবং আফগান জনগণের মৌলিক অধিকারকে সম্মান করে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে, আফগান নারীদের কণ্ঠস্বরকে সমর্থন করা এবং তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া অপরিহার্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *