Headlines

প্রাক্তন আইজি পঙ্কজ দত্তর প্রতি কথিত হেনস্থা: রাষ্ট্র বনাম প্রতিবাদীর লড়াই

প্রাক্তন আইজি পঙ্কজ দত্তর প্রতি কথিত হেনস্থা: রাষ্ট্র বনাম প্রতিবাদীর লড়াই Photo by Mouli Ghosh on Pexels

প্রয়াত রাজ্যের প্রাক্তন আইজি পঙ্কজ দত্তর স্ত্রী ইন্দ্রানী দত্ত সম্প্রতি এবিপি আনন্দের ‘যুক্তি তক্কো’ অনুষ্ঠানে তাঁর স্বামীর প্রতি হওয়া ব্যাপক হেনস্থা ও রাষ্ট্রের কথিত লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তুলেছেন। ১৭ মাস আগে পঙ্কজ দত্তর মৃত্যুর কারণ হিসাবে তিনি এই মানসিক চাপকেই দায়ী করেছেন, যার মধ্যে ছিল নিরাপত্তা প্রত্যাহার, আইনি লড়াই এবং চরিত্র হনন। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলি রাজ্যের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের প্রতি আচরণের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

পটভূমি: একজন আইজির নীরব লড়াই

পঙ্কজ দত্ত, একদা রাজ্যের একজন সম্মানিত আইজি, বারাণসীতে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্দ্রানী দত্তর দাবি অনুযায়ী, সিস্টেম ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে সত্যি কথা বলার মাশুল তাকে জীবন দিয়ে গুনতে হয়েছে। সম্মানীয় এই পুলিশ আধিকারিককে বিনা কারণে থানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়, যা তার প্রতি চরম লাঞ্ছনা ও অপমান ছিল। এই মানসিক আঘাত তিনি সহ্য করতে পারেননি বলে ইন্দ্রানী অভিযোগ করেছেন।

এই হেনস্থার মাঝেই রাজ্যের তৎকালীন সরকার হঠাৎ করেই পঙ্কজ দত্তর নিরাপত্তা তুলে নেয়। এর কোনো কারণ জানানো হয়নি। ইন্দ্রানী দত্ত তার স্বামীর প্রতি হওয়া এই অবিচারের কথা বলতে গিয়ে আজও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

রাষ্ট্রের কথিত লক্ষ্যবস্তু: ইন্দ্রানী দত্তর বয়ান

ইন্দ্রানী দত্তের ভাষ্য অনুযায়ী, “রাষ্ট্র যখন কোনো প্রতিবাদীকে টার্গেট করে, তিনি যেই হোন না কেন, একজন প্রাক্তন আইপিএস অফিসার হতে পারেন। তিনি আপনার প্রশাসনকে সাবধান করছিলেন, অনেক পরামর্শও দিচ্ছিলেন, তাঁকে টার্গেট করলেন। রাস্তা থেকে তাঁর নিরাপত্তা সরিয়ে নেওয়া হল। একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না।” তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কীভাবে একজন নিচু স্তরের পুলিশ কর্মকর্তা পঙ্কজ দত্তকে নিরাপত্তা প্রত্যাহারের কথা জানালে সেই নিরাপত্তাকর্মী নিজেও কেঁদে ফেলেন। পঙ্কজ দত্ত তখন তার নিরাপত্তাকর্মীকে নিজের চাকরি বাঁচাতে চলে যেতে বলেন, কারণ তার জীবন তখন শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেছিলেন।

এরপর পঙ্কজ দত্ত চিঠি দিয়ে নিরাপত্তা প্রত্যাহারের কারণ জানতে চাইলেও কোনো উত্তর পাননি। বাধ্য হয়ে তিনি নিজের পেনশনের টাকায় হাইকোর্টে মামলা করেন। হাইকোর্টের একক বেঞ্চে সরকার হেরে যাওয়ার পর, করদাতার টাকায় ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করে। ইন্দ্রানী দত্ত প্রশ্ন তোলেন, “ভাবুন, আমার স্বামী হাইকোর্টে যাচ্ছেন তাঁর পেনশনের টাকায় সরকারের থেকে নিজের সিকিউরিটি ছিনিয়ে আনতে, আর সরকার আমার আপনার ট্যাক্সের টাকায় কী কারণে টার্গেট করে একজন অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসারের সিকিউরিটি কেড়ে নেওয়া যায় তার সদুত্তর দিতে না পেরে ডিভিশন বেঞ্চে চলে যাচ্ছে।” সেখানেও সরকার হেরে যায়।

চরিত্র হনন ও পুলিশি হেনস্থা

আদালতে হেরে যাওয়ার পরেও কথিত হয়রানি থামেনি। ইন্দ্রানী দত্তর অভিযোগ, সরকার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিলেও “দেখা যাক অন্য কোন প্যাঁচে ফেলতে পারি” এমন মনোভাব নিয়ে কাজ করেছে। একটি প্রতিবাদ মঞ্চের একটি অর্ধ-লাইন বক্তব্যকে “পোষ্য চ্যানেলগুলোকে দিয়ে নৃশংস ভাবে, অনৈতিক ভাবে, ইয়েলো জার্নালিজম করে” ভাইরাল করা হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে তার চরিত্র হনন করা হয়।

ভুয়ো এফআইআর দায়ের করে তাকে হেনস্থা করা হয়। দুর্গাপূজার সময়, যখন তার স্ত্রী হাসপাতালে অসুস্থ ছিলেন, চতুর্থীর দিন পঙ্কজ দত্তকে বটতলা থানায় ৬ ঘণ্টা বসিয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ইন্দ্রানী দত্তের মতে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাড়িতেও আসা যেত। সেদিন থানায় জড়ো করা কিছু লোকের মাধ্যমে তাকে জুতার মালা পরানোর চেষ্টা করা হয়। ইন্দ্রানী আক্ষেপ করে বলেন, “যাঁর মাথায় রাষ্ট্রপতির পদক, রাজ্যের পদক রয়েছে, সারা জীবন মানুষকে সেবা দিয়েছেন, তাঁকে এ ভাবে কষ্ট দিতে আপনাকে একটু গায়ে লাগল না… রাষ্ট্র কীভাবে টার্গেট করল দেখুন।”

প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পথ

প্রাক্তন আইজি পঙ্কজ দত্তর প্রতি এই কথিত আচরণ সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে যারা ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে চান। একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে যদি এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, তবে সাধারণ নাগরিক বা নিম্নপদস্থ কর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই ঘটনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি অসহিষ্ণুতার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

এই অভিযোগগুলি বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং একজন ব্যক্তির অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়, তা এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভবিষ্যতে, সরকারি কর্মকর্তাদের সুরক্ষায় কী ধরনের আইনি কাঠামো প্রয়োজন এবং গণমাধ্যমের নৈতিকতা কিভাবে বজায় রাখা সম্ভব, তা নিয়ে নীতি নির্ধারকদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। এই ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *