২২ শে মে ভারতের খুচরো বাজারে সোনার দাম এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর ফলে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে গয়না কেনার প্রথাগত অভ্যাসে বড়সড় বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে সোনার দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় পশ্চিমবঙ্গসহ সারা দেশের গয়না ব্যবসায়ীরা বর্তমানে এক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই আকাশছোঁয়া দামের কারণে সাধারণ মানুষ এখন ভারী ও ঐতিহ্যবাহী গয়নার পরিবর্তে হালকা ওজনের অলঙ্কার এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে গোল্ড কয়েনের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও দামের গতিপ্রকৃতি
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৪ ক্যারেট সোনার প্রতি ১০ গ্রামের দাম ইতোমধ্যে ৭৪,০০০ থেকে ৭৫,০০০ টাকার গণ্ডি স্পর্শ করেছে। এর পাশাপাশি ২২ ক্যারেট সোনার দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, যা মধ্যবিত্তের নাগালে বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল্যের ওঠানামা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বিশ্বজুড়ে বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে, যেখানে প্রতিদিন দামের নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।
পেট্রোল ও ডিজেলের দামের মতো সোনার দামের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ে টান ফেলছে। বড় বিপণি থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট সোনার দোকান—সব জায়গাতেই ক্রেতাদের ভিড় কমছে। যারাও বা আসছেন, তাদের অধিকাংশই বিয়ের প্রয়োজনীয় গয়না কিনছেন অত্যন্ত হিসেব করে। গত কয়েক বছরে সোনার দামে এমন ধারাবাহিক বৃদ্ধি খুব একটা দেখা যায়নি বলে দাবি করছেন অনেক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী।
ক্রেতাদের আচরণে আমূল পরিবর্তন
সোনার দাম বাড়ার ফলে গয়না কেনার ধরনে একটি বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান। আগে যেখানে বিয়ের মরসুমে ভারী নেকলেস বা চুরির চাহিদা থাকত তুঙ্গে, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ‘লাইটওয়েট’ বা হালকা ওজনের গয়না। আধুনিক নকশা এবং কম ওজনের কারণে এই গয়নাগুলো দৈনন্দিন ব্যবহারের পাশাপাশি সামাজিক অনুষ্ঠানেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, এখন ১ গ্রাম থেকে ৫ গ্রামের মধ্যে কানের দুল বা আংটির চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে, গয়না তৈরির মজুরি বা ‘মেকিং চার্জ’ সাশ্রয় করতে অনেক ক্রেতা এখন গয়নার বদলে সোনার কয়েন বা বার কেনাকে বেশি লাভজনক মনে করছেন। গয়না কেনার ক্ষেত্রে মজুরি বাবদ একটি বড় অংক ব্যয় হয়, যা পুনরায় বিক্রির সময় ফেরত পাওয়া যায় না। কিন্তু গোল্ড কয়েনের ক্ষেত্রে এই লোকসান নেই বললেই চলে। ফলে সাধারণ মানুষ এখন অলঙ্কারের চেয়ে সম্পদ হিসেবে সোনা ধরে রাখতেই বেশি পছন্দ করছেন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বিশেষজ্ঞের মত
বিশ্ববাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতি আউন্স সোনার দাম ইতোমধ্যে ২,৪০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কিছু আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, যদি বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা বজায় থাকে, তবে ভবিষ্যতে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৩,০০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলোতে এই দামের প্রভাব সরাসরি খুচরো বাজারে পড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্বারা সোনার মজুদ বাড়ানো এবং মুদ্রাস্ফীতি প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে সোনার ব্যবহার এই দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সোনার এই দাম বৃদ্ধি কেবল সাময়িক কোনো ঘটনা নয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা যত বাড়বে, সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ ততটাই বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে সোনার দাম কমার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, সামনের দিনগুলোতে সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ৮০,০০০ টাকা ছাড়িয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
শিল্পের ওপর প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সোনার দাম বৃদ্ধির ফলে গয়না শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগররা চরম সংকটে পড়েছেন। গয়নার অর্ডার কমে যাওয়ায় অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বড় ব্র্যান্ডগুলো তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এখন ডিজিটাল গোল্ড বা গোল্ড ইটিএফ (ETF)-এর মতো বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ক্রেতাদের উৎসাহিত করছে। এর ফলে গয়না শিল্পের সনাতনী কাঠামোটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।
আগামী বিয়ের মরসুমগুলোতে এই উচ্চমূল্য বজায় থাকলে গয়না ব্যবসার টার্নওভার আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ডিজিটাল সোনার জনপ্রিয়তা বাড়লে বাজারে তারল্য বজায় থাকবে। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় সরকার বা রিজার্ভ ব্যাংক সোনার আমদানিতে কোনো শুল্ক হ্রাস করে কি না, যা স্থানীয় বাজারে দাম কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে। ক্রেতা এবং ব্যবসায়ী উভয়েই এখন বাজারের স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।