পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিক্কেই (Nikkei) সংবাদমাধ্যমের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত একটি চুক্তির অধীনে এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। এই সমঝোতার আওতায় ইরান কোনো ধরনের ট্রানজিট ফি ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেবে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
চুক্তির পটভূমি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে চলা অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছিল। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলমান আলোচনা অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত নিরসনে উভয় দেশ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ৩০ দিন পর এই জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে। এই পদক্ষেপকে ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিক্কেই-এর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সংঘর্ষবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানের শীর্ষস্থানীয় মধ্যস্থতাকারী এবং বিদেশমন্ত্রী কাতারের রাজধানী দোহায় গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিস্তারিত বৈঠক করেছেন।
বিশ্ব অর্থনীতিতে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল এবং এলপিজি (LPG) গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথে যে কোনো ধরনের বাধা বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই এলাকায় উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। বীমা খরচ বৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচলের গতি কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির সংকট তীব্রতর হয়েছিল। হরমুজ প্রণালী পুনরায় অবাধ চলাচলের জন্য খুলে দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
তেহরান এবং ওয়াশিংটন উভয় পক্ষ থেকেই বর্তমানে একটি ইতিবাচক আবহ তৈরির চেষ্টা চলছে। যদিও উভয় পক্ষই স্বীকার করছে যে, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে এখনও কিছু মতপার্থক্য বা ‘ফাঁকফোকর’ রয়ে গেছে। তবে মধ্যস্থতাকারীরা গত কয়েকদিন ধরে ওই অঞ্চলে আপেক্ষিক শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এই আলোচনা প্রসঙ্গে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, ইরানের সাথে আলোচনা ‘ভালভাবে’ এগোচ্ছে। তবে তিনি এও সতর্ক করেছেন যে, হয় একটি ‘অসাধারণ চুক্তি’ হবে অথবা কোনো চুক্তিই হবে না। এই অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও কূটনৈতিক মহল আশাবাদী যে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে উভয় পক্ষই নমনীয় হবে।
চুক্তির শর্তাবলি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত চুক্তির অধীনে ইরান জাহাজের জন্য যে কোনো ট্রানজিট ফি বা শুল্ক আদায় বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য একটি বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা ছাড়াই নিরাপদে এই অঞ্চল অতিক্রম করতে পারবে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত রাখা এবং আমেরিকার পক্ষ থেকে কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টিও এই আলোচনার টেবিলে রয়েছে বলে জানা গেছে। যদি এই ৬০ দিনের সংঘর্ষবিরতি সফল হয়, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে।
প্রভাব এবং আগামী দিনের লক্ষ্য
এই সমঝোতা কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো, যারা তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশের জন্য পারস্য উপসাগরের তেলের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক খবর, কারণ তেলের দাম কমলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এখন দেখার বিষয় হলো, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে কি না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বর্তমানে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে নজর রাখছেন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া কেবল একটি আঞ্চলিক বিজয় নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত।