পাকিস্তানে সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ককরোচ আওয়ামি পার্টি’ (CAP), যা মূলত সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্রতিবাদের রূপ নিয়েছে। ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (CJP) বিপুল জনপ্রিয়তায় অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তানি যুবসমাজ, বিশেষ করে বেকার স্নাতক ও মধ্যবিত্ত নাগরিকরা এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। ইসলামাবাদের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রভাবের মুখে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার কঠিন লড়াইকে ফুটিয়ে তুলতেই এই অভিনব প্রতীকী নামকরণ করা হয়েছে।
আরশোলা কেন প্রতিবাদের প্রতীক?
পৃথিবীর বুকে আরশোলা বা ককরোচ এমন এক পতঙ্গ যা চরম প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ বিপর্যয়েও আরশোলা টিকে থাকতে সক্ষম। এদের এই ‘সারভাইভাল ইনস্টিন্কট’ বা টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতাকে হাতিয়ার করেই এই আন্দোলনের সূচনা। উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমান পাকিস্তান সরকার ও সমাজ যাদের ‘আরশোলা’ ভেবে অবহেলা করে বা পদদলিত করতে চায়, তাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠাই এই দলের মূল লক্ষ্য।
উর্দু ভাষায় ‘আওয়ামি’ শব্দের অর্থ হলো সাধারণ মানুষ বা জনগণ। ফলে ‘ককরোচ আওয়ামি পার্টি’র আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের একটি প্ল্যাটফর্ম। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি রাজনৈতিক দল মনে হলেও, এটি মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার মিম ও প্যারোডি কনটেন্টের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইনস্টাগ্রামে এই আন্দোলনটি রাতারাতি ভাইরাল হয়েছে, যেখানে যুবসমাজ তাদের দৈনন্দিন বঞ্চনার কথা তুলে ধরছে।
পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ
পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে জেলবন্দি করার পর থেকেই দেশটির রাজনীতিতে অস্থিরতা ও বিভাজন চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেওয়াজ শরিফের সরকার ক্ষমতায় থাকলেও, সাধারণ মানুষের ধারণা পর্দার আড়াল থেকে আসল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছেন সেনাপ্রধান আসিম মুনির। এই ‘হাইব্রিড’ শাসনব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। মাঠে নেমে সরাসরি প্রতিবাদ করার সুযোগ সীমিত হওয়ায় পাকিস্তানি যুব প্রজন্ম ডিজিটাল মাধ্যমকে তাদের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
বেকারত্ব, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, পেট্রোল ও বিদ্যুতের আকাশছোঁয়া দাম এবং মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়া এই আন্দোলনের মূল জ্বালানি। পাকিস্তানের বেকার স্নাতক, ফ্রিল্যান্সার এবং হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, সিস্টেম তাদের প্রতিনিয়ত শোষণ করছে। এই শোষণ ও অবহেলার বিরুদ্ধে একটি ব্যঙ্গাত্মক কিন্তু শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে ‘ককরোচ আওয়ামি পার্টি’। তারা বোঝাতে চাইছে, সিস্টেম যতই চাপ দিক না কেন, আরশোলার মতোই তারা টিকে থাকবে এবং লড়াই চালিয়ে যাবে।
ভারত ও পাকিস্তানের আন্দোলনের তুলনামূলক চিত্র
ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) এবং পাকিস্তানের ‘ককরোচ আওয়ামি পার্টি’র (CAP) মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য ও মিল রয়েছে। ভারতে এই আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে, যেখানে পরোক্ষভাবে বেকার যুবকদের একাংশকে ‘পরজীবী’ বা ‘আরশোলা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। সেই অপমানের জবাব দিতেই অভিজিৎ দিপকে ভারতে এই দলের সূচনা করেন। ভারতের CJP-র এখন একটি নির্দিষ্ট ইশতেহার, ওয়েবসাইট এবং সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে, এমনকি তারা নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার কথাও ভাবছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানে এই আন্দোলনটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ফল নয়, বরং এটি ভারতের সফল ট্রেন্ড থেকে অনুপ্রাণিত একটি বৃহত্তর সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। CAP-এর এখনও কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। এটি মূলত মিম, রিলস এবং হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। পাকিস্তানের এই পেজগুলোর বায়ো-তে মজার ছলে লেখা হয়েছে, “হ্যাঁ, আমরা ভারত থেকে আইডিয়াটা কপি করেছি, কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য তো একই!” এটি প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের যুবসমাজের সমস্যাগুলো কতটা সমান্তরাল।
ডিজিটাল যুগে ‘জেন-জি’র নতুন রাজনৈতিক ভাষা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত বা পাকিস্তান—উভয় দেশেরই ‘জেন-জি’ (Gen-Z) বা তরুণ প্রজন্ম এখন প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে ইন্টারনেটের নিজস্ব ভাষায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের তীব্র ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। তারা বড় কোনো রাজনৈতিক দলের মিছিলে না গিয়েও মিম ও কৌতুকের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা করছে। এই ডিজিটাল ব্যঙ্গ আসলে একটি গভীর সামাজিক অসন্তোষের প্রতিফলন, যা প্রথাগত মিডিয়া বা রাজনীতি প্রায়ই এড়িয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের মুভমেন্টগুলো প্রমাণ করে যে তরুণরা এখন আর প্রথাগত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নয়। তারা নিজেদের মতো করে একটি পরিচয় তৈরি করতে চায়। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই আন্দোলনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ সেখানে সরাসরি সামরিক বা রাজনৈতিক সমালোচনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মিমের আড়ালে এই প্রতিবাদ তরুণদের একটি ‘সেফ স্পেস’ বা নিরাপদ জায়গা করে দিচ্ছে যেখানে তারা তাদের ক্ষোভ ভাগ করে নিতে পারছে।
সামনের দিনগুলোতে এই ‘ককরোচ আওয়ামি পার্টি’ কতটা সাংগঠনিক রূপ নিতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এটি কি কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী ইন্টারনেট ট্রেন্ড হিসেবেই হারিয়ে যাবে, নাকি ভারতের মতো পাকিস্তানেও এটি কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। বিশেষ করে পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে এই ধরনের ডিজিটাল বিদ্রোহ জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।