বলিউড পরিচালক ইমতিয়াজ় আলির ২০১৫ সালের চলচ্চিত্র ‘তমাশা’ মুক্তির প্রায় এক দশক পরেও দর্শকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই সিনেমাটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বা নিজের পেশাগত জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে বহু মানুষ তাদের করপোরেট চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র বেদান্ত সাহনি—যিনি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের বেড়াজালে নিজের সৃজনশীল সত্তাকে হারিয়ে ফেলেছিলেন—তার এই লড়াই আজও অসংখ্য পেশাজীবীর জীবনবোধকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট ও দর্শকনন্দিত হওয়ার কারণ
‘তমাশা’ মূলত আত্মপরিচয়ের সন্ধানের গল্প। বেদান্তের চরিত্রে রণবীর কাপুরের অভিনয় এবং ইমতিয়াজ়ের চিত্রনাট্য এমন এক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে, যেখানে মানুষ সাফল্যের ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়ে নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে বিসর্জন দেয়। সিনেমাটি মুক্তির সময় মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি ‘কাল্ট ক্লাসিক’ মর্যাদা পেয়েছে।
বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা দীর্ঘ সময় ধরে করপোরেট সংস্কৃতির চাপে পিষ্ট, তারা বেদান্তের চরিত্রে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছেন। সিনেমাটির গান, সংলাপ এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি দর্শকদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে—আমরা কি কেবল বেঁচে থাকার জন্য কাজ করছি, নাকি কাজ করতে গিয়ে বেঁচে থাকাকে ভুলে যাচ্ছি?
পেশাজীবীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে দেখা যাচ্ছে, অনেক পেশাজীবী ‘তমাশা’র প্রভাব স্বীকার করছেন। অনেকেই দাবি করেছেন, এই সিনেমাটি দেখার পর তারা তাদের একঘেয়ে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজের পছন্দের কাজে ফেরার সাহস পেয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ এবং সৃজনশীলতার অভাব বর্তমান প্রজন্মের কর্মীদের মধ্যে এক ধরণের ‘কুইট কুইটিং’ বা চাকরি ছাড়ার প্রবণতা তৈরি করেছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সিনেমার চরিত্রগুলোর সাথে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া মানুষের মধ্যে এক ধরণের ক্যাথারসিস বা আবেগীয় মুক্তি ঘটায়। যখন একজন দর্শক পর্দায় দেখেন যে তার মতো অন্য কেউও একই সংকটে ভুগছে, তখন তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি আত্মবিশ্বাস পান।
ইমতিয়াজ় আলির দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুশোচনা
পরিচালক ইমতিয়াজ় আলি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সিনেমাটি নিয়ে মানুষের এমন প্রতিক্রিয়া তাকে বিস্মিত করেছে। তিনি স্বীকার করেছেন যে, অনেক সময় নিজের কাজ নিয়ে তার মনেও প্রশ্নের উদয় হয়। তিনি কি সচেতনভাবে মানুষকে চাকরি ছাড়তে উৎসাহিত করছেন? ইমতিয়াজ়ের মতে, সিনেমাটি মূলত মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, যা যেকোনো সমাজ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও করণীয়
‘তমাশা’র এই প্রভাব কেবল একটি সিনেমার জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আধুনিক কর্মসংস্কৃতির একটি বড় ত্রুটির দিকে আঙুল তুলছে। আগামী দিনে করপোরেট সংস্থাগুলো যদি কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং কাজের স্বাধীনতার দিকে নজর না দেয়, তবে দক্ষ জনশক্তি হারানোর ঝুঁকি বাড়বে। দর্শকরা এখন কেবল বেতনের জন্য কাজ করতে রাজি নন, তারা কাজের মধ্যে একটি ‘পারপাস’ বা উদ্দেশ্য খুঁজছেন। এই প্রবণতা আগামীতে কর্মসংস্থানের মডেলগুলোতে বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।