Headlines

কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপানের হুঙ্কার: পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে ‘ঘুমন্ত দৈত্য’?

কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপানের হুঙ্কার: পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে 'ঘুমন্ত দৈত্য'? Photo by Pixabay on Pexels

বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবং ঐতিহাসিক অভিযোগের ভিত্তিতে জাপান সম্প্রতি রাশিয়ার কাছ থেকে তার ‘উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ড’ বা কুরিল দ্বীপপুঞ্জ ফেরত চেয়ে জোরালো দাবি তুলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, প্রায় ৮১ বছর আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক অধিকৃত এই দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে জাপানের এই নতুন দৃঢ়তা, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের দ্বারা আরও উদ্দীপিত হয়েছে। এর ফলে জাপানের দীর্ঘদিনের শান্তিবাদী সংবিধান এবং এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য বিবেচনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে, যা পূর্ব এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যকে নাটকীয়ভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অমীমাংসিত বিবাদ

কুরিল দ্বীপপুঞ্জ, যা জাপানে ‘উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ড’ নামে পরিচিত, হোক্কাইডো দ্বীপের উত্তরে এবং রাশিয়ার সাখালিন অঞ্চলের পূর্বে অবস্থিত একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপমালা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে, ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই দ্বীপপুঞ্জ দখল করে। এর পর থেকে রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) এই দ্বীপপুঞ্জকে তার নিজস্ব ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে, কিন্তু জাপান এটিকে তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করে।

এই ভূখণ্ডগত বিরোধের কারণে জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে আজও কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ১৯৫৬ সালের যৌথ ঘোষণায় সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটি ছোট দ্বীপ (শিকোতান ও হাবোমাই) জাপানের কাছে ফেরত দিতে রাজি হয়েছিল যদি একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, কিন্তু জাপান চারটি দ্বীপেরই মালিকানা দাবি করে। এই অচলাবস্থা দীর্ঘকাল ধরে দুই দেশের সম্পর্কের উপর ছায়া ফেলে রেখেছে।

জাপানের সংবিধানের ৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশটি যুদ্ধের অধিকার ত্যাগ করেছে এবং আত্মরক্ষামূলক বাহিনী ছাড়া কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক বাহিনী পোষণ করে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে জাপান পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন বিশ্ব গড়ার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। তবে, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই দীর্ঘদিনের নীতি প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

জাপানের পরিবর্তিত অবস্থান এবং পারমাণবিক জল্পনা

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জাপান রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মিলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই পরিস্থিতিতে, জাপান কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে তার দাবি আরও জোরালো করেছে। জাপানি কর্তৃপক্ষ রাশিয়ার দখলদারিত্বকে ‘অবৈধ’ বলে বর্ণনা করেছে, যা পূর্বে ব্যবহৃত ‘দখলকৃত’ শব্দটির চেয়েও তীব্র।

এই পরিবর্তিত সুরের পাশাপাশি, কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে জাপানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে ‘ঘুমন্ত দৈত্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এমন জল্পনাও শোনা যাচ্ছে যে, জাপান ৫,৫০০ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার নীতিতে অটল, তবে দেশের মধ্যে কিছু রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ এবং সামরিক বিশ্লেষক পারমাণবিক বিকল্প নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শুরু করেছেন।

জাপানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে। দেশটির কাছে প্রচুর পরিমাণে প্লুটোনিয়াম মজুদ আছে এবং উন্নত রকেট ও মহাকাশ প্রযুক্তি রয়েছে, যা তাত্ত্বিকভাবে তাদের স্বল্প সময়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার ক্ষমতা দেয়। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকি এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি, জাপানের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাই, আত্মরক্ষার প্রশ্নে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে এই জল্পনা।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আঞ্চলিক প্রভাব

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের এই কঠোর অবস্থান রাশিয়ার উপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হতে পারে। টোকিও আশা করছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া আন্তর্জাতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো নমনীয়তার লক্ষণ দেখা যায়নি; বরং তারা কুরিল দ্বীপপুঞ্জে সামরিক মহড়া চালিয়ে জাপানের দাবিকে উপেক্ষা করেছে।

জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট সম্প্রতি রেকর্ড পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে, যা দেশের সামরিক সক্ষমতা আধুনিকীকরণের দিকে ইঙ্গিত করে। এটি জাপানের আত্মরক্ষামূলক সামরিক বাহিনীর ধারণাকে আরও প্রসারিত করছে। যদি জাপান সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে পা বাড়ায়, তবে তা পূর্ব এশিয়ায় এক নতুন অস্ত্রের প্রতিযোগিতা শুরু করতে পারে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। চীন এবং উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (CSIS) এক বিশ্লেষক বলেছেন, জাপানের পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার আলোচনা সম্ভবত একটি সতর্কবার্তা, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে। এটি জাপানের নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষার একটি অংশ, তবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি একটি দীর্ঘ এবং জটিল প্রক্রিয়া, যা জাপানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ভবিষ্যৎ কী?

জাপানের এই নতুন দৃঢ়তা তার ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা কৌশলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক আরও অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রের জল্পনা জাপানকে একটি জটিল নৈতিক ও কৌশলগত দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে। যদিও জাপান সরকার পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার নীতিতে এখনও অটল, তবে আঞ্চলিক হুমকির মুখে এই নীতি কতদিন ধরে রাখতে পারবে তা দেখার বিষয়। এই পরিস্থিতি পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জাপানের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর সতর্ক নজর রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *