কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং ও অ্যাসেসমেন্ট বিভাগের পাঠানো একাধিক নোটিসকে কেন্দ্র করে এবার সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সংস্থা এবং আত্মীয়দের মালিকানাধীন সম্পত্তিতে ‘বেআইনি’ নির্মাণের অভিযোগ তুলে যে ১৭টি নোটিস দেওয়া হয়েছে, সে প্রসঙ্গে তিনি সাফ জানিয়েছেন, পুরসভা আগে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করুক কোন অংশটি অবৈধ। এই ঘটনায় একদিকে যেমন প্রশাসনিক সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তেমনই শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেও তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব অস্বস্তি ও দূরত্ব তৈরির প্রবণতা।
প্রেক্ষাপট: শুভেন্দুর অভিযোগ ও পুরসভার ত্বরিত পদক্ষেপ
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তি নিয়ে সরব ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সম্প্রতি তিনি সরাসরি এই নিয়ে অভিযোগ তোলার পরেই নড়েচড়ে বসে কলকাতা পুরসভা প্রশাসন। কালীঘাট রোড এবং হরিশ মুখার্জি রোডে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের সদস্যদের এবং তাঁর সংস্থার নামে থাকা একাধিক সম্পত্তিতে তল্লাশি ও নথিপত্র পরীক্ষার কাজ শুরু হয়। এরপরই একে একে ১৭টি নোটিস পাঠানো হয়, যার মধ্যে ১৪টি নোটিসই গিয়েছে ৯ নম্বর বরো এলাকা থেকে।
বিতর্কিত নোটিস ও অভিষেকের কড়া প্রতিক্রিয়া
কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগ এবং অ্যাসেসমেন্ট বিভাগ থেকে পাঠানো এই নোটিসগুলোতে মূলত দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্মাণের নকশা বা বিল্ডিং প্ল্যান জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কিছু সম্পত্তিতে বেআইনি নির্মাণ এবং সম্পত্তির চরিত্র বদলের (Change of nature) অভিযোগ আনা হয়েছে। পুরসভা সূত্রের খবর, কলকাতা পুর আইনের ৪০১ ধারায় এই নোটিসগুলো পাঠানো হয়েছে, যা সাধারণত অবৈধ নির্মাণ বন্ধ বা ভাঙার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যাঁরা এসব প্রশ্ন করছেন, তাঁরা কলকাতা পুরসভাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, অবৈধ অংশটা কোথায়? আগে জিজ্ঞেস করে আসুন, তারপরে আমার থেকে উত্তর নেবেন। নির্দিষ্ট করে জিজ্ঞেস করে আসুন কোনটা অবৈধ অংশ, যে অবৈধ অংশ মার্ক করে দেবে, আমার থেকে উত্তর নিয়ে যাবেন।’ তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি প্রকারান্তরে পুরসভার অভিযোগের সত্যতাকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
তৃণমূলের অন্দরে ফাটল ও ফিরহাদ হাকিমের ভূমিকা
এই নোটিসকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম দাবি করেছেন যে, এই নোটিস পাঠানোর বিষয়ে তিনি আগে থেকে কিছুই জানতেন না। মেয়রের এই বয়ান রাজনৈতিক মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, মেয়রের অজান্তে কীভাবে তাঁরই দপ্তরের আধিকারিকরা দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতার বিরুদ্ধে এতগুলো নোটিস জারি করলেন? এই ঘটনায় মেয়রের গলায় একধরণের ক্ষোভ ও অসহায়তা প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, এই ঘটনার আঁচ পড়েছে পুরসভার প্রশাসনিক স্তরেও। ৯ নম্বর বরোর চেয়ারপার্সন পদ থেকে আচমকা ইস্তফা দিয়েছেন তৃণমূল কাউন্সিলর দেবলীনা বিশ্বাস। যদিও তাঁর ইস্তফার পিছনে ব্যক্তিগত কারণের কথা বলা হচ্ছে, তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিষেকের সম্পত্তিতে নোটিস যাওয়ার ঘটনায় যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামলাতে না পেরেই এই পদক্ষেপ। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দলের অনেক শীর্ষ নেতাই এখন এই ইস্যু থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন।
তথ্য ও আইনি মারপ্যাঁচ
পুরসভা সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কালীঘাট ও হরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ি দুটির নির্মাণ বিধি মেনে হয়েছে কি না, তা নিয়েই মূল তদন্ত চলছে। বিল্ডিং প্ল্যানে কোনো বাড়তি অংশ যোগ করা হয়েছে কি না বা অনুমতি ছাড়া কোনো সংস্কার হয়েছে কি না, তা যাচাই করতেই ৪০১ ধারার প্রয়োগ। কলকাতা পুরসভার রেকর্ডে এই সম্পত্তিগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং জমা দেওয়া প্ল্যানের মধ্যে অমিল পাওয়া গিয়েছে বলেই প্রাথমিক অভিযোগ।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা অবশ্য একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের মতে, দলের অন্দরে অভিষেককে কোণঠাসা করতেই প্রশাসনের একটি অংশকে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবির বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে দাবি করছে যে, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত এবং বেআইনি নির্মাণ প্রমাণিত হলে তা ভেঙে ফেলা দরকার।
রাজনৈতিক প্রভাব ও আগামী দিনের সম্ভাবনা
এই নোটিসকাণ্ডের ফলে তৃণমূলের অন্দরে ‘পুরানো বনাম নতুন’ দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। একদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন স্বচ্ছতা ও নির্দিষ্ট তথ্যের দাবি তুলছেন, তখন দলের একাংশ নেতার দূরত্ব বজায় রাখা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলে যেতে পারে। মেয়রের ‘অজ্ঞতা’ এবং কাউন্সিলরের ইস্তফা—এই দুটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোথাও একটা সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে।
আগামী দিনে কলকাতা পুরসভা অভিষেকের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সুনির্দিষ্টভাবে ‘অবৈধ অংশ’ চিহ্নিত করতে পারে কি না, সেটাই দেখার। যদি পুরসভা প্রমাণ পেশ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা অভিষেকের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। আর যদি প্রমাণ পেশ করা হয়, তবে তা আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি তৃণমূলের অন্দরে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দেবে। নজর থাকবে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং এই নিয়ে নবান্ন ও পুরসভার মধ্যেকার সমন্বয়ের ওপর।