Headlines

গরম থেকে বাঁচতে সোজা এসি ঘরে ঢুকে পড়া শরীরের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

গরম থেকে বাঁচতে সোজা এসি ঘরে ঢুকে পড়া শরীরের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? Photo by Helena Lopes on Pexels

তীব্র দাবদাহে বাইরে থেকে ঘামে ভেজা শরীরে সরাসরি এসির ঠান্ডা বাতাসে প্রবেশ করা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা। বর্তমান গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ স্বস্তি পেতে দ্রুত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে আশ্রয় নিচ্ছেন, যা হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই অভ্যাসের ফলে শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে ‘থার্মাল শক’ বা হিট স্ট্রোকের মতো জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায়, শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এবং বাইরের পরিবেশের তাপমাত্রার মধ্যে যখন বিশাল পার্থক্য তৈরি হয়, তখন মানবদেহ তা মানিয়ে নিতে হিমশিম খায়। বাইরে প্রচণ্ড গরমে রক্তনালীগুলো প্রসারিত থাকে, কিন্তু এসির ঠান্ডা বাতাসে ঢোকার সাথে সাথে সেগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। এই দ্রুত পরিবর্তনের ফলে রক্তচাপের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগীদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।

শরীরের ওপর এসির তাৎক্ষণিক প্রভাব

শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী মেকানিজম বা হাইপোথ্যালামাস যখন হঠাৎ এই পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়, তখন শরীরে প্রবল চাপের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যাদের শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এই অভ্যাসটি ফুসফুসের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, ঘর্মাক্ত শরীরে সরাসরি এসির সামনে দাঁড়ালে ঘাম শুকানোর বদলে ত্বকের লোমকূপ বন্ধ হয়ে যায়, যা থেকে জ্বর, সর্দি-কাশি এবং পেশিতে টান লাগার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সতর্কবার্তা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. এনামুল হক জানান, বাইরে থেকে ঘরে ঢুকেই এসির তাপমাত্রা ১৬ বা ১৮ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনা সবচেয়ে বড় ভুল। তার মতে, শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে আসার জন্য অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় দেওয়া উচিত। তিনি পরামর্শ দেন, বাইরে থেকে এসে কিছুক্ষণ সাধারণ ফ্যানের নিচে বসে শরীর শুকিয়ে তারপর এসি চালানো উচিত।

এছাড়া, এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে বাতাসে জমে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘক্ষণ এসিতে থাকার ফলে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা তৈরি হয়, যা ত্বক ও চোখের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিকার

এই অভ্যাসটি শুধুমাত্র সাময়িক শারীরিক অস্বস্তি নয়, বরং স্নায়বিক দুর্বলতারও কারণ হতে পারে। হঠাৎ ঠান্ডা ও গরমের এই অদলবদল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষের জন্য পরামর্শ হলো, এসির তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা। এটি যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী, তেমনি শরীরের জন্য সহনীয়।

এছাড়া, ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। এসি ঘর থেকে বের হওয়ার আগে কিছুক্ষণ এসি বন্ধ করে বাইরের তাপমাত্রার সাথে মানিয়ে নেওয়া উচিত। এই ছোট পরিবর্তনগুলো বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণ ও করণীয়

আগামী দিনগুলোতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যার ফলে এসির ব্যবহার আরও বাড়বে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন এসির নিরাপদ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন এবং আগামীতে এসি থেকে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টের রোগীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। গরমের তীব্রতা মোকাবিলায় এসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পর্যাপ্ত জল পান করা এবং সুতির হালকা পোশাক পরিধানের অভ্যাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *