পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে যাতে ‘SIR’ বা বিশেষ সময়কালের মধ্যে বিভিন্ন পুরসভা থেকে ইস্যু করা জন্ম সংশাপত্রগুলি (Birth Certificates) পুনরায় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত দুর্নীতি এবং নথিপত্র কারচুপির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের পুরসভাগুলোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে কলকাতা পুরসভা সহ বিভিন্ন শহরের ইস্যু করা সংশাপত্রগুলোর বৈধতা এখন স্ক্যানারের নিচে।
প্রেক্ষাপট: জন্ম সংশাপত্র নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল বেশ কিছুকাল আগে, যখন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছিলেন যে, SIR চলাকালীন ভোটার তালিকা সংশোধন ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে বিপুল সংখ্যক জাল জন্ম সংশাপত্র তৈরি করা হয়েছে। তাঁর দাবি ছিল, এই সংশাপত্রগুলি প্রকৃত নাগরিকদের জন্য নয়, বরং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব ও বসবাসের আইনি ভিত্তি প্রদানের জন্য অনৈতিকভাবে বিতরণ করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে এই মর্মে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা হচ্ছিল। বর্তমানে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তদন্তের মূল লক্ষ্য ও প্রশাসনিক তৎপরতা
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, SIR পর্বে যে সমস্ত জন্ম সংশাপত্র ইস্যু করা হয়েছে, সেগুলোর তথ্য যাচাই করা হবে। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে কলকাতা পুরসভার কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। সূত্রের খবর, এই বৈঠকে মূলত আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে এই বিশাল সংখ্যক নথিপত্র যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে। পুরসভার ডিজিটাল ডেটাবেসের সঙ্গে হাসপাতালের রেকর্ড এবং আবেদনপত্রের সত্যতা মিলিয়ে দেখা হবে। কোনো ক্ষেত্রে অসংগতি ধরা পড়লে সেই সংশাপত্র বাতিল করার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
বিজেপির অভিযোগ ও ‘হোম বার্থ’ বিতর্ক
জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা এই প্রসঙ্গে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর মতে, SIR-এর নামে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ‘বাড়িতে জন্ম’ বা ‘হোম বার্থ’ দেখিয়ে সংশাপত্র নেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যুগে হঠাৎ করে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর বাড়িতে জন্ম নেওয়ার দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত। বিজেপির দাবি, এটি একটি সুপরিকল্পিত কারচুপি যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ‘ঢপে’ তৈরি হওয়া বার্থ সার্টিফিকেটগুলো চিহ্নিত করাই এখন তদন্তকারীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
কলকাতা পুরসভার অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া
অন্যদিকে, কলকাতা পুরসভার ডেপুটি মেয়র তথা মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) অতীন ঘোষ সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেননি। তিনি জানিয়েছেন, পুরসভা সবসময়ই স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে এবং আগেও এই বিষয়ে বিরোধী দলনেতার আরটিআই-এর জবাব দেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সরকার যদি রিভিউ করতে চায় তবে পুরসভার পক্ষ থেকে তাতে কোনো বাধা নেই। তবে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রতিটি সার্টিফিকেটের পেছনে নির্দিষ্ট নথিপত্র থাকে এবং ঢালাও অভিযোগ করার আগে তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ মহলের মতামত ও তথ্যের গুরুত্ব
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্ম সংশাপত্র একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল নথি যা নাগরিকত্বের প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। যদি কোনো স্তরে জালিয়াতি হয়ে থাকে, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। ডেটা অ্যানালিস্টদের মতে, গত কয়েক বছরের জন্ম হারের পরিসংখ্যান এবং ইস্যু করা সার্টিফিকেটের সংখ্যার মধ্যে তুলনা করলে অসংগতিগুলো সহজেই ধরা পড়তে পারে। বিশেষ করে যে সমস্ত এলাকায় হঠাৎ করে জন্ম হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই এলাকাগুলোকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত চালানো হতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও নাগরিক ভোগান্তির আশঙ্কা
এই তদন্ত প্রক্রিয়ার ফলে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। যদি যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে নতুন সংশাপত্র ইস্যু বা সংশোধনের কাজে দেরি হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, প্রকৃত নাগরিকদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। এই পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে জালিয়াতি বন্ধ হবে এবং ডিজিটাল সিস্টেমে তথ্যের নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। শিল্পের ক্ষেত্রে বা সরকারি চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে জন্ম সংশাপত্রের নির্ভরযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে স্বাস্থ্য দফতর এবং পুরসভাগুলোর যৌথ দল প্রতিটি ওয়ার্ড ভিত্তিক ডেটা অডিট শুরু করবে। এই তদন্তের রিপোর্ট সরাসরি নবান্নে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তদন্তে কোনো বড়সড় চক্রের হদিশ মেলে কি না এবং কত শতাংশ সংশাপত্র শেষ পর্যন্ত অবৈধ ঘোষিত হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। ডিজিটাল ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় কোনো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে ওয়াকিবহাল মহলের।