কলকাতা: রাজনৈতিক দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙন ও সংসদীয় দলে বিদ্রোহের আবহাওয়া বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, তৃণমূল বিধায়ক কাকলি ঘোষ দস্তিদার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তাঁর অবস্থান এবং দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছেন, যা দিল্লিতে এনডিএ-র অংশ হতে চেয়ে বিদ্রোহীদের একটি স্বতন্ত্র ব্লকের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার দীর্ঘ চার দশক ধরে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। তিনি মনে করেন, একটি রাজনৈতিক দলের মাহাত্ম্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। যারা ২০১১ সালের পর দলে যোগ দিয়েছেন, তারা ক্ষমতালোভী হতে পারেন, কিন্তু তাঁর মতো পুরোনো কর্মীরা দলের জন্য দীর্ঘ লড়াই করেছেন। তিনি জানান, ১৯৮৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমবার যাদবপুর থেকে লোকসভায় দাঁড়ানোর পর থেকে তিনি পাঁচবার বিভিন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং হেরেছেন। তবুও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং অনুন্নয়নের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন। এই লড়াইয়ের মাধ্যমেই তিনি ২০০৯ সালে এবং দল ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে।
তবে, কাকলি ঘোষ দস্তিদার বর্তমান রাজ্য সরকারের শেষ পাঁচ-ছয় বছরে অনৈতিকতা, অনুন্নয়ন এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা বাসা বেঁধেছে বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, আরজি করের মতো ঘটনা তাঁর বিশ্বাস ও আস্থায় আঘাত হেনেছে। তিনি মাঝে মাঝে দলের মধ্যে এই বিষয়গুলো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন, কিন্তু তা শোনা হয়নি। তিনি আরও জানান যে, যারা বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে বা দলের অন্য নেতাদের গালিগালাজ করছেন, তারা তখন কোথায় ছিলেন যখন তিনি ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯ সালে হেরেও দলের জন্য লড়ে যাচ্ছিলেন। তিনি এই ধরনের আক্রমণের শিকার হতে রাজি নন।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার আরও বলেন যে, গত ১৫ দিনে দলের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি এবং তাঁর মতো আরও কিছু বিধায়ক মানুষের স্বার্থে কাজ করতে না পেরে আলাদাভাবে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তিনি ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না’ এই প্রবাদ বাক্যটি উল্লেখ করেন।
দিল্লিতে ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তরে কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানান যে, আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে বাংলার জনগণ তৃণমূলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, রাজ্যে অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি এবং সর্বস্তরে ‘কাটমানি’-র প্রভাব, উন্নয়ন না হওয়া – এই সবকিছুর বিরুদ্ধেই মানুষের রায় এসেছে। তিনি মনে করেন, আরজি করের ঘটনা এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে, যেখানে একজন মহিলাকে তাঁর কর্মক্ষেত্রে ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে এবং প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করা হয়েছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দেয় যে, তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে। দলের একাংশ নিজেদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে। আরজি করের মতো ঘটনা দলের ভাবমূর্তিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার বিষয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিদ্রোহ তৃণমূলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জনমানসে সৃষ্ট নেতিবাচক ধারণা আগামী নির্বাচনগুলিতে প্রভাব ফেলতে পারে। দল কীভাবে এই সংকট কাটিয়ে ওঠে এবং নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়, তা আগামী দিনে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে।