পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সাম্প্রতিক ফলাফলে রাজ্যের শাসনক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পাশাপাশি উঠে এসেছে এক নতুন নির্বাচনী ট্রেন্ড। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার অভিজাত হাইরাইজ আবাসন বা কমপ্লেক্সগুলিতে ভোটগ্রহণ কেন্দ্র স্থাপনের অভিনব উদ্যোগের পর, এই কেন্দ্রগুলিতে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তৃণমূল কংগ্রেসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে রয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী এই নির্বাচনে, নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার পর থেকেই শহরের আবাসনগুলোর ভোটের এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক মহলে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আবাসনে ভোটকেন্দ্র: একটি নতুন নির্বাচনী কৌশল
নির্বাচন কমিশন প্রথমবারের মতো কলকাতা এবং শহরতলির ৬৫টি বড় আবাসনের অভ্যন্তরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। এই উদ্যোগের ফলে ভোটাররা নিজ আবাসনের নিরাপত্তার বলয়ে নির্বিঘ্নে ভোটদানের সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে ভোটদানের হার যেমন বেড়েছে, তেমনই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই নির্দিষ্ট ভোটব্যাংকের পছন্দও স্পষ্ট হয়েছে।
বিজেপির আধিপত্য ও ভোটারদের প্রবণতা
নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শহরের অভিজাত আবাসনগুলোতে বিজেপির জয়ের হার অত্যন্ত প্রকট। বাইপাস সংলগ্ন ‘আরবানা’ আবাসনে ৯২০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশ ভোট পড়েছে, যার মধ্যে ৫৫০টি ভোট গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে। একই চিত্র দেখা গিয়েছে যাদবপুরের সাউথ সিটি এবং অন্যান্য নামী কমপ্লেক্সগুলোতেও।
সিলভার স্প্রিং অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সঞ্জয় সিংহ রাঠৌরের মতে, ভোটাররা এবার ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের অভিজ্ঞতার আশায় বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন। অনেক আবাসিকই মনে করছেন, কমপ্লেক্সের ভেতরে ভোটকেন্দ্র হওয়ায় তারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর ঝক্কি থেকে মুক্তি পেয়েছেন এবং ভোটদানে উৎসাহিত হয়েছেন।
পরিসংখ্যান ও জনমত
তথ্য অনুযায়ী, ‘অ্যাক্টিভ একরস’ আবাসনে ৮৫ শতাংশ ভোটের মধ্যে ৭০ শতাংশই বিজেপির দখলে। এছাড়া ডায়মন্ড সিটি, জেনেক্স ভ্যালি এবং ইমামি সিটির মতো হাইরাইজগুলোতে ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটদানের হার রেকর্ড করা হয়েছে, যার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, শহরের উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ এবার পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে।
ভবিষ্যতের প্রভাব ও পর্যবেক্ষণ
আবাসনের ভেতরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের এই মডেল একদিকে যেমন ভোটদানের হার বাড়াতে সফল হয়েছে, অন্যদিকে এটি শহরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের শক্তঘাঁটি হিসেবে পরিচিত শহরগুলোতে হাইরাইজ বাসিন্দাদের এই রায় আগামী দিনে রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও প্রশাসনিক নীতিতে কী প্রভাব ফেলে, তা দেখার অপেক্ষায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নতুন সরকারের কাছে এই ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।