কলকাতা: সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে দলের শোচনীয় ফলাফলের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসে (TMC) অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। এই আবহে বারাসাতের জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তৃণমূলের লোকসভার সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। রবিবার তিনি দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। নিজের পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি জেলায় দলের ভরাডুবির দায়ভার গ্রহণ করলেও, সরাসরি আঙুল তুলেছেন ভোট কুশলী সংস্থা আইপ্যাকের বিরুদ্ধে।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার অভিযোগ করেছেন, আইপ্যাকের সদস্যরা তাঁর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেছে। তিনি দাবি করেন, গত কয়েক মাস ধরে তিনি আইপ্যাকের মানসিক অত্যাচারে ভুগেছেন। এই বিষয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, “হঠাৎ করে কোনও ভুঁইফোড় সংস্থা এল, তারা এসে ধমকাল। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে বসে ধমকে যাচ্ছে। আমি রাজনীতি করছি ৪০-৪২ বছর। একটা মেয়ের বয়স ২২ বছর। সে এসে ধমকে যাচ্ছে এখানে!”
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিশ্চিত করেন যে তিনি আইপ্যাকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করছেন। কাকলি আরও বলেন, “আপনারা বুঝে নিন। হ্যাঁ, তাই। তারা তো সারাক্ষণ ধমকাচ্ছে! কী করে রাজনীতি করতে হবে, কী করে ভোট করতে হবে, কী করে… এবারের ভোটটা দেখুন। সর্বনাশ করার মূলে যদি কেউ থাকে, তাহলে ওই সংস্থা। একেবারে সর্বনাশ করে দিয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে তিনি আইপ্যাককে নিয়োগ করেননি এবং যারা নিয়োগ করেছে তারাই এর কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে। তবে তাঁর মতে, অল্পবয়সী আইপ্যাক কর্মীরা তাঁদের হেনস্থা করেছে এবং তাদের নির্দেশিত পথ সঠিক ছিল না, যার ফলে এই বিপর্যয়।
আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে প্রশ্ন ওঠা নতুন নয়। একাধিক নেতা-নেত্রী ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমনকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কেও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে কিনা বা তিনি তাঁকে সব জানিয়েছেন কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে কাকলি বলেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ব্যস্ত রয়েছেন’। এটি তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে কিনা, সেই জল্পনা উস্কে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে লোকসভার মুখ্য সচেতকের পদ থেকে সরিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই পদে ফিরিয়ে এনেছিলেন। সেই সময়ও কাকলি প্রকাশ্যে তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এরপর তিনি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ায় তৃণমূলের অন্দরে গুঞ্জন শুরু হয়। যেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ফিরহাদ হাকিমের মতো হেভিওয়েট নেতাদের নিরাপত্তা কমানো হয়েছে, সেখানে কাকলি কীভাবে নিরাপত্তা পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যদিও কাকলির দাবি, ভোটের পর তাঁর বাড়িতে হামলা হয়েছিল এবং তিনি বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন, তাই কেন্দ্র তাঁকে নিরাপত্তা দিয়েছে।
এই ঘটনাগুলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসে এক বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আইপ্যাকের মতো সংস্থার ভূমিকা এবং পুরনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যেকার টানাপোড়েন দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই অসন্তোষ আগামী দিনে দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।