Headlines

বিশ্ববাজারে তেলের দামে উল্লম্ফন: ট্রাম্পের ‘জোটশক্তি’ গঠনের প্রচেষ্টা ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন

বিশ্ববাজারে তেলের দামে উল্লম্ফন: ট্রাম্পের 'জোটশক্তি' গঠনের প্রচেষ্টা ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন Photo by DeLuca G on Pexels

হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি আন্তর্জাতিক ‘জোটশক্তি’ গঠনের পথ খুঁজছে। সম্প্রতি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়তেই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে, যার ফলে ওয়াশিংটন গভীর উদ্বেগে রয়েছে। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কড়া অবস্থানের জেরেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ

বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম জুন মাসের সরবরাহের জন্য ব্যারেল প্রতি ১২৫ মার্কিন ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১১ হাজার ৮৬১ টাকা। এটি ২০২২ সালের পর চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক ধাক্কায় ১২০ ডলারের মার্জিন ছাড়িয়ে যায়, যদিও দিনের শেষে তা ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলারে নেমে আসে। একইভাবে, আমেরিকা ভিত্তিক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI)-এর দাম ১০৭ ডলারে পৌঁছেছিল, যা পরে ১০৫ ডলারে স্থিতিশীল হয়। এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির মূলে রয়েছে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এবং শান্তি আলোচনায় অচলাবস্থা।

ট্রাম্পের কড়া অবস্থান ও সামরিক ইঙ্গিত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসার জন্য বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরান পারমাণবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন না করলে তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তি করা সম্ভব নয়। ট্রাম্পের এই কড়া মনোভাব এবং সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত বিশ্ববাজারে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শান্তি আলোচনায় বারবার কাঁটা ফেলার কারণেই তেলের দামে এই আগুন লেগেছে।

ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ও জোট গঠনের উদ্যোগ

এই পরিস্থিতি আমেরিকার জন্যও অনুকূল নয়। রয়টার্স সূত্রে খবর, হরমুজ প্রণালীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বজায় রাখতে আমেরিকা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। একটি আন্তর্জাতিক জোটশক্তি তৈরির মাধ্যমে তারা এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিমধ্যেই প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়ে গিয়েছে, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এই বিশাল আর্থিক ব্যয় এবং তেলের দামবৃদ্ধি ওয়াশিংটনের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাব

ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট, সেখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। ফলে এর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং দাম আরও বাড়তে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র দেশগুলির সঙ্গে এই জোটশক্তি গঠনের বার্তা দিচ্ছে, যার উদ্দেশ্য হল ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তবে এই জোট কতটা কার্যকর হবে এবং ইরান এর প্রতিক্রিয়ায় কী পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পেন্টাগনের ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের তথ্য প্রমাণ করে যে, এই সংঘাতের আর্থিক বোঝা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপরও পড়ছে। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণভাবেও মার্কিন ভোক্তাদের উপর চাপ বাড়ছে, যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। যদিও কিছু সময় আগে ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা জানিয়েছিলেন যে, পেট্রোল-ডিজেলের দাম আপাতত অপরিবর্তিত থাকবে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে পারে কিনা, সেই প্রশ্ন এখন থেকেই উঠছে। বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে, জ্বালানির উচ্চ মূল্য মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আগামীর পথ

তেল বাজারের বিশেষজ্ঞরা এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর নীতিকে দায়ী করছেন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরবরাহ চেইন এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। রয়টার্সের মতো সংবাদ সংস্থাগুলি নিয়মিতভাবে মার্কিন প্রশাসনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং সামরিক ব্যয়ের উপর নজর রাখছে, যা এই সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে।

এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ট্রাম্পের ‘জোটশক্তি’ গঠনের প্রচেষ্টা যদি সফল হয়, তবে ইরানের উপর বহিরাগত চাপ আরও বাড়বে। অন্যদিকে, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বজায় রাখে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারিত হতে পারে। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলিকে এখন জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য। আগামী মাসগুলিতে, হরমুজ প্রণালীতে সামরিক উপস্থিতি, মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক আলোচনা (যদি শুরু হয়) এবং তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর এর প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই অস্থিরতা কেবল জ্বালানি বাজার নয়, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সম্পর্ককেও গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *