Headlines

রক্ষাকবচ চেয়ে হাইকোর্টে তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল, অধরা তিনি

রক্ষাকবচ চেয়ে হাইকোর্টে তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল, অধরা তিনি Photo by Th2city Santana on Pexels

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন রক্ষাকবচ চেয়ে, যখন পুলিশ তাঁকে হুমকিকাণ্ডে খুঁজছে এবং তাঁর পুত্র বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র সহ গ্রেফতার হয়েছেন। এই ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয় যখন দিলীপ মণ্ডল বিধানসভা ভোটের পর বিজেপির উদ্দেশে উস্কানিমূলক হুমকি দেন, যার প্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু হয়। গত কয়েকদিন ধরে পুলিশ তাঁকে খুঁজে না পেলেও, তাঁর ছেলে অভীক মণ্ডল ওরফে অর্ঘ্য এবং তার চার সঙ্গীকে অবৈধ বন্দুক ও গুলিসহ বকখালি থেকে ফেরার পথে আটক করে পুলিশ। বিধায়কের এই আইনি পদক্ষেপ এবং তাঁর ছেলের গ্রেফতারি রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনপ্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

পেছনের কথা: হুমকির মামলা ও বিধায়কের নাটকীয় পলায়ন

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর, বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল প্রকাশ্যে বিজেপির কর্মীদের উদ্দেশে কড়া হুঁশিয়ারি দেন। পুলিশ সূত্রে খবর, তাঁর এই মন্তব্যকে হুমকি হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় জামিন অযোগ্য মামলা দায়ের করা হয়। এরপর থেকেই পুলিশ তাঁকে গ্রেফতারের জন্য তল্লাশি শুরু করে। গত বৃহস্পতিবার, পুলিশ যখন দিলীপ মণ্ডলের খোঁজে তাঁর নির্মীয়মাণ বাড়িতে অভিযান চালায়, তখন এক নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ পৌঁছনোর মাত্র কিছুক্ষণ আগে বিধায়ক খালি পায়ে বাড়ির পিছন দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ড্রেন, জলাজমি, মাঠ টপকে এবং পগার পার হয়ে পুলিশের নজর এড়ান। এই পালানোর সময় তাড়াহুড়োয় তাঁর পরনের পাজামা ছিঁড়ে যায়। এই ঘটনা রাজ্যজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এবং একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এমন আচরণ জনমানসে বিতর্কের জন্ম দেয়।

পুত্রের গ্রেফতারি: আগ্নেয়াস্ত্র ও সঙ্গীদের নিয়ে

বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল যখন অধরা, ঠিক তখনই তাঁর পরিবার নতুন করে শিরোনামে আসে তাঁর ছেলে অভীক মণ্ডল ওরফে অর্ঘ্যের গ্রেফতারির ঘটনায়। গত সোমবার, পুলিশ সূত্রে গোপন খবর আসে যে বিধায়ক-পুত্র অভীক তার দলবল নিয়ে বকখালি গেছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ডায়মন্ড হারবার থানা এবং রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) যৌথভাবে অভিযান চালায়। বকখালি থেকে ফেরার পথে বিধায়ক-পুত্রের গাড়ি আটকানো হয় এবং তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশ সূত্রে দাবি, তল্লাশিতে একটি বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র এবং চারটি কার্তুজ উদ্ধার হয়। এরপরই অভীক মণ্ডল এবং তাঁর চার সঙ্গীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। বাজেয়াপ্ত করা হয় তাঁদের ব্যবহৃত একটি গাড়িও। এই ঘটনা শুধু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, বরং জনপ্রতিনিধিদের পরিবারের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগের কারণে রাজনৈতিক মহলেও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।

রক্ষাকবচের আবেদন: হাইকোর্টের দ্বারস্থ বিধায়ক

পুলিশের লাগাতার তল্লাশি এবং ছেলের গ্রেফতারির পর, তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল নিজের সুরক্ষার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তিনি বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ‘রক্ষাকবচ’ বা আগাম জামিনের আবেদন জানিয়েছেন। এই আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি সম্ভবত গ্রেফতারি এড়াতে চাইছেন এবং আদালত থেকে একটি সুরক্ষা আদেশ পাওয়ার চেষ্টা করছেন। সাধারণত, জামিন অযোগ্য ধারায় অভিযুক্ত হলে আগাম জামিন পাওয়া কঠিন হয়, তবে আদালত পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। এই আবেদনের শুনানি কবে হবে এবং হাইকোর্ট কী রায় দেয়, তার উপর দিলীপ মণ্ডলের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।

আইনগত জটিলতা ও রাজনৈতিক চাপ

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন নির্বাচিত বিধায়কের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু হওয়া এবং এরপর তাঁর পলাতক থাকা একটি গুরুতর বিষয়। এর উপর তাঁর ছেলের বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র সহ গ্রেফতারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই ঘটনাগুলি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনা নিয়ে প্রবল অস্বস্তিতে পড়েছে। বিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে বিজেপি, এই সুযোগে তৃণমূলের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে আরও উত্তাপ ছড়াবে। জনপ্রতিনিধিদের এমন আচরণ জনমানসে তাঁদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে এবং দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে, বিশেষত যখন দল আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভবিষ্যৎ গতিপথ ও নজর রাখার বিষয়

দিলীপ মণ্ডলের হাইকোর্টে রক্ষাকবচ চাওয়ার আবেদন এবং পুলিশের লাগাতার তল্লাশি অভিযান— এই দুটি বিষয়ই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। হাইকোর্ট যদি তাঁর আবেদন খারিজ করে দেয়, তবে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতারের জন্য আরও তৎপর হবে এবং তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, যদি হাইকোর্ট তাঁকে কিছুদিনের জন্য রক্ষাকবচ দেয়, তবে তা পুলিশের জন্য একটি সাময়িক ধাক্কা হবে। তবে, মামলা চলবে এবং চূড়ান্ত আইনি রায় আসার আগে পর্যন্ত বিধায়ককে আইনি জটিলতা মোকাবেলা করতে হবে। এই ঘটনা তৃণমূল কংগ্রেসের উপর কতটা চাপ সৃষ্টি করে এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই পরিস্থিতিতে কী ভূমিকা নেয়, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। রাজ্য রাজনীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার প্রশ্নে এই মামলার চূড়ান্ত পরিণতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *