Headlines

রাজেশ এক্সপোর্টস বনাম সেবি: ১৫ লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ, বাজারে নিষিদ্ধ সংস্থা

রাজেশ এক্সপোর্টস বনাম সেবি: ১৫ লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ, বাজারে নিষিদ্ধ সংস্থা Photo by Monstera Production on Pexels

নয়াদিল্লি: যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এমনিতেই টালমাটাল অবস্থা। সেই অবস্থায় ফের জোর ধাক্কা। দালাল স্ট্রিট থেকে এবার বড় ধরনের দুর্নীতির খবর সামনে এল। এতদিন দেশের অন্যতম সেরা ‘সাকসেস স্টোরি’ হিসেবে যাদের নাম উচ্চারিত হতো, সেই Rajesh Exports-এর বিরুদ্ধেই এবার ১৫ লক্ষ কোটি টাকার কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, Rajesh Exports এবং সংস্থার প্রোমোটার তথা চেয়ারম্যানকে আপাতত বাজারে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা SEBI.

বিরাট বড় কেলেঙ্কারি দেশে

Rajesh Exports-এর সদর দফতর বেঙ্গালুরুতে। বিশ্বমানের সোনা এবং রত্ন বিক্রেতা সংস্থা হিসেবে বাজারে জায়গা করে নিয়েছিল Rajesh Exports। ৩ জুন তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা বসিয়েছে SEBI। আর তার পরই, বৃহস্পতিবার বাজারে তাদের শেয়ার দরে ৫ শতাংশ পতন ঘটেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে SEBI। এই পরিমাণ কেলেঙ্কারি হতে পারে বলে কল্পনাও করতে পারছেন না কেউ। কারণ বহু দেশের বার্ষিক অর্থনৈতির উৎপাদনও ওই অঙ্কের ধারেকাছে নেই।

ওই সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ মারাত্মক। SEBI জানিয়েছে, টানা পাঁচ বছর ধরে আর্থিক অবস্থা সংক্রান্ত বিকৃত তথ্য পেশ করেছে Rajesh Exports। বিদেশের সহযোগী সংস্থাগুলির দ্বারা নিজেদের অর্থনৈতিক কার্যাবলী বাড়িয়ে দেখিয়েছিল তারা, যাতে তাদের ঘোষিত আয়ের হিসেব ছিল ১৫৮. ৩ বিলিয়ন ডলার বা ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু এই বিস্ময়কর অঙ্ক দেখেও এতদিন কারও মনে সন্দেহ জাগল না? প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। SEBI-র তদন্ত চূড়ান্তও নয়। কিন্তু গোটা বিষয়টি সামনে আসতেই দালাল স্ট্রিটে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার প্রদত্ত তথ্য, তাদের উপর তদারকি এবং বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ ও সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে সর্বত্র। তবে একদিনে এমনটা ঘটেনি, কিছু দিন ধরেই সন্দেহ দানা বাঁধছিল।

২০২৪ সালেই অভিযোগ জমা পড়ে

২০২৪ সালের ১১ মার্চ প্রথমবার শেয়ারহোল্ডারদের তরফে অভিযোগ জানানো হয় SEBI-র কাছে। জানানো হয়, দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে অনেকের পাওনা বাকি রয়েছে। কিছুতেই টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করে SEBI। ফরেন্সিক অডিটর BDO-কে দিয়ে সব কিছু খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়। শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত কোনও সংস্থার বিরুদ্ধে শুরু হয় তদন্ত।

তবে ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার অঙ্কই এখন ভাবিয়ে তুলেছে সকলকে। SEBI-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবর্ষে পর্যন্ত সময়কালে Rajesh Exports-এর প্রায় সম্পূর্ণ আয়ই বিদেশের সহযোগী সংস্থাগুলির কাছ থেকে আসে, মোট ঘোষিত বিক্রিবাটার ৯৭-৯৯ শতাংশই। সুইৎজ়ারল্যান্ডের Valcambi SA সংস্থার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। বহু বছর আগে ওই সংস্থাটি অধিগ্রহণ করে Rajesh Exports। তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসার মেরুদণ্ড ছিল Valcambi SA। অন্য ভর্তুকিপ্রাপ্ত সংস্থার নথি খতিয়ে দেখে আরও বিরাট অসামঞ্জস্য এবং গরমিল ধরা পড়ে। SEBI জানিয়েছে, সামগ্রিক আয়ের যে হিসেব তুলে ধরা হয়েছিল, তা সহযোগী সংস্থাগুলির যাচাইযোগ্য আয়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের আয়ের হিসেবে ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার সামগ্রিক গরমিল ধরা পড়ে। ওই সময়কালে যে সামগ্রিক আয়ের হিসেব প্রকাশ করে Rajesh Exports, তার প্রায় সমতুল্য। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে, কর্পোরেট সেক্টরে আয়ের তথ্য বিকৃতি নিয়ে যত মামলা হয়েছে দেশের ইতিহাসে, তার মধ্যে এটি অন্যতম বৃহত্তম ঘটনা হিসেবে গণ্য হবে।

SEBI কী বলছে?

কিন্তু কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস করতে এত সময় লাগল কেন? জানা যাচ্ছে, তদন্তে লাগাতার বাধার মুখে পড়তে হয়। তদন্তকারীদের বহু নথি দিতে অস্বীকার করে Rajesh Exports। গ্রাহকের রেকর্ড, ভেন্ডারদের নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, কিছুই সম্পূর্ণ ভাবে হাতে তুলে দেওয়া হয়নি তদন্তকারীদের। তদন্তে সেভাবে সহযোগিতাও মেলেনি। ফলে অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়েই কাজ শুরু করতে হয়।

আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছেন তদন্তকারীরা। জানা গিয়েছে, আফ্রিকার একটি স্বর্ণখনিতে ১০৩৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল Rajesh Exports। কিন্তু সেই বিনিয়োগের অস্তিত্ব প্রমাণ এবং মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নথি দিতে পারেনি তারা। ব্যালান্স শিটে সম্পদের পরিমাণ অতিরঞ্জিত করে দেখানো হলেও, তা প্রমাণের উপায় ছিল না।

কী করে পর্দাফাঁস?

আরও যে একটি বিষয় ভাবিয়ে তোলে তদন্তকারীদের, তা হল, অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য। SEBI-র তথ্য বলছে, অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে যথাক্রমে ১১৪৮৭ এবং ১১৪৮৮ কোটি টাকার ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত লেনদেন নথিবদ্ধ ছিল। কিন্তু অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেড ওই লেনদেনের কথা অস্বীকার করে। তারা জানায়, Rajesh Exports কোনও কালেই তাদের গ্রাহক ছিল না, কোনও চুক্তি হয়নি তাদের মধ্যে। আর তাতেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা।

সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব?

পাশাপাশি, সংস্থার তহবিল থেকে টাকা এদিক ওদিক করা হয়েছিল বলেও জানা গিয়েছে। রাজেশ মেহতার সঙ্গে সংযোগ রয়েছে, এমন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকানো হয়। পরবর্তীতে সেই টাকা ব্যবহার করা হয়েছিল ‘পার্সোনাল ডেরিভেটিং ট্রেডিং’য়ে। এর মধ্যে রাজেশের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ঢোকে ৭.৪ কোটি টাকা। পরে ওই টাকার কিছুটা আবার ফেরে সংস্থার তহবিলে। SEBI-র দাবি, এই লেনদেনে সায় ছিল না বোর্ডের। বিনিয়োগকারীদের জানানোও হয়নি কিছু।

এত কিছুর মধ্যে ফেঁসে গিয়েছেন লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারী। এর মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়ছে, ভারতীয় জীবন বিমা সংস্থা LIC-কে ঘিরে। কারণ Rajesh Exports-এ ১০.৮ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে তাদের। গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের টাকাই বিভিন্ন সংস্থায় বিনিয়োগ করে LIC। ফলে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। SEBI-র হিসেব অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত Rajesh Exports-এ LIC-র বিনিয়োগ ছিল ৩৩.৫৮ কোটি। রিটেল ইনভেস্টরদের অংশীদারিত্ব ১৪.৩ শতাংশ। বিনিয়োগ ছিল ৪৩৬ কোটি টাকা। সাধারণ মানুষের ৭৭০ কোটি টাকা এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কানারা ব্যাঙ্কের প্রায় ৫০৯ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে Rajesh Exports থেকে।

কী অবস্থা এখন?

SEBI-র নির্দেশ আসার পর Rajesh Exports-এর শেয়ারে ৫ শতাংশ পতন ঘটেছে। তবে বেশ কিছু বছর ধরেই টালমাটাল পরিস্থিতি চলছিল। গত তিন বছরে Rajesh Exports-এর শেয়ারের মূল্য ৮০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছে। ঋণের দায়ে রীতিমতো ধুঁকছিল। এখনও SEBI-র তরফে তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট আসেনি। অভিযোগের জবাব দেওয়ারও সুযোগ পাবেন রাজেশ মেহতা এবং তাঁর সংস্থা Rajesh Exports। তবে এখন থেকেই প্রমাদ গোনা শুরু করে দিয়েছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগের খানিকটাও যদি সত্য হয়, সেক্ষেত্রে ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা। শুধু তাই নয়, ভারতের কর্পোরেট ক্ষেত্রের জন্যেও এই ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *