লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গাঁধীর ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিলের দাবিতে এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি নতুন পিটিশন জমা পড়েছে। আইনজীবী অশোক পাণ্ডে এবং দন্ত চিকিৎসক রাজনেশ কুমার সিংহ লখনউ বেঞ্চে এই আবেদন জানিয়েছেন, যেখানে তাঁরা রাহুলের রায়বরেলী লোকসভা কেন্দ্রের সদস্যপদও খারিজের দাবি তুলেছেন। আবেদনকারীদের দাবি, রাহুল গাঁধী ব্রিটেনের নাগরিক হওয়ার সপক্ষে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে এবং ভারতের সংবিধান অনুযায়ী তিনি এ দেশের সাংসদ হওয়ার যোগ্য নন। বিচারপতি শেখর সরাফ এবং বিচারপতি অবধেশ কুমার চৌধরির ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
নাগরিকত্ব বিতর্কের প্রেক্ষাপট ও মূল অভিযোগ
রাহুল গাঁধীর নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় কয়েক বছর আগে। আবেদনকারীদের প্রধান অভিযোগের ভিত্তি হলো ২০০৩ সালে ব্রিটেনে নিবন্ধিত একটি সংস্থা, যার নাম ‘M/S Backops Limited’। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, ২১ অগাস্ট ২০০৩ সালে এই সংস্থাটি যখন গড়ে ওঠে, তখন ব্রিটেনের সরকারি নথিতে রাহুল গাঁধীকে সেই সংস্থার ডিরেক্টর এবং অন্যতম শেয়ার হোল্ডার হিসেবে দেখানো হয়েছিল। সেখানে তাঁর একটি লন্ডনের ঠিকানাও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনকারীরা আদালতে জমা দেওয়া নথিতে দাবি করেছেন যে, ওই সংস্থা সংক্রান্ত বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায় রাহুল গাঁধী নিজেকে ব্রিটেনের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অমেঠী কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় রাহুল তাঁর জমা দেওয়া হলফনামাতেও এই ‘M/S Backops Limited’-এর মালিকানার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। আবেদনকারীদের মতে, এটি সরাসরি ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের পরিপন্থী।
আইনি ধারা ও সংবিধানের ৯ নং অনুচ্ছেদ
ভারতীয় সংবিধানের ৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনো ভারতীয় নাগরিক স্বেচ্ছায় অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। আবেদনকারী আইনজীবী অশোক পাণ্ডে এই আইনি পয়েন্টটিকেই সামনে রেখেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, রাহুল গাঁধী যেহেতু ব্রিটিশ নথিতে নিজেকে সেদেশের নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাই তাঁর ভারতীয় পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব বজায় রাখার কোনো আইনি অধিকার নেই।
পিটিশনে আরও বলা হয়েছে যে, একজন অ-ভারতীয় নাগরিক ভারতের সংসদের সদস্য হতে পারেন না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act) অনুযায়ী, ভারতের লোকসভা বা রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার প্রাথমিক শর্তই হলো ভারতের নাগরিক হওয়া। যদি নাগরিকত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে রাহুল গাঁধীর রায়বরেলীর সাংসদ পদটিও অবৈধ বলে গণ্য হওয়া উচিত বলে আবেদনকারীরা মনে করছেন।
পুরানো মামলা ও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান
এটিই প্রথমবার নয় যে রাহুল গাঁধীর নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালেও আইনজীবী অশোক পাণ্ডে একই দাবিতে এলাহাবাদ হাইকোর্টে আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁর অভিযোগ ছিল যে, ব্রিটেনে আয়কর জমা দেওয়ার সময় রাহুল নিজেকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে সেই সময় হাইকোর্ট আবেদনটি খারিজ করে দিয়ে জানিয়েছিল যে, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত।
২০১৯ সালেও রাজনেশ কুমার সিংহ একই ধরনের দাবি নিয়ে আদালতে গিয়েছিলেন। এছাড়া বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ সুব্রহ্মণ্যম স্বামীও ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে রাহুলের নাগরিকত্ব নিয়ে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পক্ষ থেকে রাহুল গাঁধীকে একটি নোটিশ পাঠিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালে কর্ণাটকের বিজেপি কর্মী এ ভিগ্নেশ শিশিরও একই অভিযোগে সরব হয়েছিলেন। বারবার একই ইস্যু ফিরে আসায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে উত্তাপ বাড়ছে।
রাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব
এই মামলার ফলাফল ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। রাহুল গাঁধী বর্তমানে লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং কংগ্রেসের প্রধান মুখ। যদি আদালত এই পিটিশন গ্রহণ করে এবং তদন্তের নির্দেশ দেয়, তবে তা কংগ্রেসের জন্য বড় আইনি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে, রাহুল গাঁধী এবং কংগ্রেস দল বরাবরই এই অভিযোগগুলিকে ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
আইনজীবীদের মতে, নাগরিকত্বের বিষয়টি নির্ধারণ করার ক্ষমতা মূলত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের। আদালত সাধারণত এই ধরনের ক্ষেত্রে সরকারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে যেহেতু এবার সরাসরি সাংসদ পদ খারিজের আবেদন জানানো হয়েছে, তাই স্পিকারের সচিবালয় বা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
এলাহাবাদ হাইকোর্টের লখনউ বেঞ্চ এখন এই পিটিশনটি শুনানির জন্য গ্রহণ করবে কি না, সেটিই দেখার বিষয়। আদালত যদি মনে করে যে আবেদনকারীদের দেওয়া নথিতে প্রাথমিক সত্যতা রয়েছে, তবে কেন্দ্রীয় সরকারকে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। ব্রিটেনের কোম্পানি হাউসের রেকর্ড এবং রাহুলের পূর্ববর্তী নির্বাচনী হলফনামাগুলি পুনরায় খতিয়ে দেখা হতে পারে। আগামী দিনগুলিতে আদালতের প্রতিটি পর্যবেক্ষণ ভারতের সংসদীয় রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।