Headlines

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার পথে ইরান ও আমেরিকা: বিশ্বজুড়ে কমতে পারে জ্বালানি সংকট

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার পথে ইরান ও আমেরিকা: বিশ্বজুড়ে কমতে পারে জ্বালানি সংকট Photo by İrfan Simsar on Pexels

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে এই জলপথ দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে তেহরান সম্মত হয়েছে, যার বিনিময়ে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত নিরসনের একটি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে ইরান এই প্রণালীটি খুলে দেবে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজের ওপর থেকে সব ধরণের ট্রানজিট ফি প্রত্যাহার করে নেবে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব

পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার ‘লাইফলাইন’ বা জীবনরেখা বলা হয়। ভৌগোলিকভাবে এটি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি সংকীর্ণ জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি (LPG) গ্যাস বাজারজাত করা হয়। গত কয়েক বছরে ইরান ও পশ্চিমী দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনার কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকা বা সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামের ওপর, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। বর্তমান এই সম্ভাব্য চুক্তিটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চুক্তির মূল শর্তাবলি ও সময়সীমা

জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে। প্রথমত, উভয় দেশ একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছানোর ৩০ দিন পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ অবাধে ও নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। ইরান বিশেষভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা এই জলপথ ব্যবহারের জন্য কোনো অতিরিক্ত কর বা ট্রানজিট ফি আদায় করবে না, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচ কমাতে সহায়ক হবে।

দ্বিতীয়ত, এপ্রিল মাস থেকে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যে অনানুষ্ঠানিক সংঘর্ষবিরতি চলছে, তার মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইরান তার বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখবে বলে জানা গেছে। এই পদক্ষেপটি মূলত ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখা এবং উভয় পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কূটনৈতিক তৎপরতা ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা

এই সমঝোতার নেপথ্যে কাতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের শীর্ষস্থানীয় মধ্যস্থতাকারী এবং দেশটির বিদেশমন্ত্রী দোহার সফরে গিয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল ইরান ও আমেরিকার মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্যগুলো কমিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছানো। তেহরান এবং ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে যে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, যদিও চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগে কিছু কারিগরি ও রাজনৈতিক জটিলতা এখনও রয়ে গেছে।

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই আলোচনার প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা বর্তমানে ‘সঠিক পথে’ এগোচ্ছে। তবে তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, হয় এটি একটি ‘অসাধারণ চুক্তি’ হবে, অথবা আদৌ কোনো চুক্তি হবে না। ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা চাইছে।

বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার সংবাদের প্রভাব ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ নিশ্চিত হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে। এটি বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর জন্য সুখবর, যারা তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ এই রুট থেকেই আমদানি করে। জ্বালানি খরচ কমলে পরিবহন ব্যয় কমবে, যা পরোক্ষভাবে খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে পার হয়। এই বিপুল পরিমাণ সরবরাহ যদি কোনো বাধার সম্মুখীন না হয়, তবে বৈশ্বিক এনার্জি মার্কেটে যে অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হবে। তবে শিল্পের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, চুক্তিটি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বাজারের এই স্বস্তি স্থায়ী নাও হতে পারে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও আগামীর পথ

আগামী কয়েক সপ্তাহ এই চুক্তির ভাগ্য নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। পর্যবেক্ষকরা নজর রাখছেন ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করে এবং আমেরিকা ইরানের জব্দ করা তহবিল বা নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। যদি ৩০ দিনের এই সময়সীমা সফলভাবে অতিক্রান্ত হয় এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত হয়, তবে তা হবে গত এক দশকের মধ্যে পশ্চিম এশিয়ায় সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য।

এখন দেখার বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই চুক্তিকে কীভাবে গ্রহণ করে। ইসরায়েল বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া এই সমঝোতার দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে দোহার পরবর্তী দফার আলোচনার দিকে, যেখানে হয়তো এই ঐতিহাসিক চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *