জনপ্রিয় র্যাপার ও সংগীতশিল্পী হানি সিং সম্প্রতি প্রকাশ্যে এনেছেন তার জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায়ের কথা, যেখানে তিনি দীর্ঘ সাত বছর ধরে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের সাথে লড়াই করেছেন। ভারতের সংগীত জগতে একসময় রাজত্ব করা এই শিল্পী গত কয়েক বছর ধরে মানসিক অস্থিরতা, তীব্র মৃত্যুভয় এবং শারীরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। এই অসুস্থতা তাকে কেবল ব্যক্তিগত জীবন থেকেই বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং তার ক্যারিয়ারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তির মেজাজ বা মুড মারাত্মকভাবে পরিবর্তিত হয়। হানি সিং জানিয়েছেন, এই রোগের চিকিৎসার জন্য তাকে যে ধরনের কড়া ওষুধ সেবন করতে হতো, তার ফলে তার চুল পড়ে যায় এবং তিনি পরচুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হন। নিজের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে তিনি কোনো রাখঢাক না করেই জানিয়েছেন, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং অসুস্থতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল।
মানসিক অস্থিরতা ও একাকীত্ব
হানি সিংয়ের ভাষ্যমতে, সেই সময় তিনি নিজেকে ‘মৃত’ বলে মনে করতেন। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চরম পর্যায়ে তিনি এতটাই আতঙ্কিত থাকতেন যে, স্নান করার সময়ও বাথরুমের দরজা বন্ধ করতেন না। তার মনে হতো, যদি তিনি ভেতরে অচেতন হয়ে পড়েন বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তবে কেউ তাকে উদ্ধার করতে পারবে না। মৃত্যুভয় তার প্রতিটি মুহূর্তকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
এক সময় শাহরুখ খান এবং অক্ষয় কুমারের মতো তারকারা তাকে সতর্ক করেছিলেন যে, অতিরিক্ত নেশা এবং অহংকার তার ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করেই তিনি নিজের ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন যে, সেই সময় তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় বলতেন, যেন তাকে এই যন্ত্রণাদায়ক জীবন থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
পেশাদার জীবনের ওপর প্রভাব
দীর্ঘ সময় জনসমক্ষ থেকে দূরে থাকার কারণে তার ভক্তরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। সংগীতশিল্পে তার অনুপস্থিতি বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছিল। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং মানসিক অবসাদ তাকে দীর্ঘ সাত বছর একপ্রকার ‘নরকবাসে’ আটকে রেখেছিল। সংগীতের মঞ্চে ফেরার পর তিনি নিজের এই সংগ্রামের কথা জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন, যা বলিউডের অন্দরমহলে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইপোলার ডিসঅর্ডার একটি গুরুতর রোগ যার যথাযথ চিকিৎসা প্রয়োজন। হানি সিংয়ের এই স্বীকারোক্তি তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি বড় বার্তা যে, খ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক বিষণ্ণতা। নিয়মিত কাউন্সিলিং এবং সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হানি সিংয়ের এই সাহসিকতা ভবিষ্যতে অনেককে তাদের মানসিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত করবে।
হানি সিং এখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং নতুন উদ্যমে কাজে ফিরেছেন। তবে তার এই লড়াই প্রমাণ করে যে, খ্যাতির চূড়ায় থাকলেও মানসিক অস্থিরতা যেকোনো সময় জীবনকে বদলে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ এই লড়াইয়ের পর তিনি তার হারানো ছন্দ কতটা দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারেন এবং তার পরবর্তী মিউজিক প্রজেক্টগুলোতে এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন কতটা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।