২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে শনিবার কলকাতার গড়িয়াহাট থানায় হাজিরা দিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের একটি বিতর্কিত সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে সমর্থন করার দায়ে তাঁকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১০৯ এবং ১৫৩ ধারায় জামিন অযোগ্য মামলা দায়ের হওয়ার পর অভিনেত্রীর বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ‘রগড়ানি’ বিতর্কের সূত্রপাত
এই আইনি জটিলতার মূল শিকড় লুকিয়ে রয়েছে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে দেওয়া একটি রাজনৈতিক বিবৃতিতে। তৎকালীন বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ শিল্পীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, “শিল্পীদের বলছি, আপনারা নাচুন, গান। আপনাদের যাত্রা শুরুই হয় রগড়ানি দিয়ে। আপনাদের অনেক রগড়ানি খেতে হবে।”
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন অর্থাৎ ২ মে, ২০২১ তারিখে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের পর অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ফেসবুকে লেখেন, ‘আজ বিশ্ব রগড়ানি দিবস ঘোষিত হোক’। সেই পোস্টে অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন, ‘হা-হা-হা, হোক হোক হোক’। এই ভার্চুয়াল কথোপকথনই এখন বড়সড় আইনি বিপাকে ফেলেছে এই দুই তারকাকে।
থানায় দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনি ধারা
শনিবার দুপুর নাগাদ গড়িয়াহাট থানায় পৌঁছান স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। তদন্তকারী অফিসাররা জানতে চান, ঠিক কী উদ্দেশ্যে তিনি সেই সময় ওই পোস্টটিকে সমর্থন করেছিলেন। বিশেষত, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজ্যে যখন বিভিন্ন জায়গায় অশান্তির খবর আসছিল, তখন এই ধরনের মন্তব্য হিংসায় ইন্ধন জুগিয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
মামলাটি দায়ের করেছেন আইনজীবী জয়দীপ সেন। তাঁর দাবি, পরমব্রত ও স্বস্তিকার ওই সোশ্যাল মিডিয়া বার্তা সরাসরি বৃহত্তর হিংসায় উস্কানি দিয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩ ধারা (দাঙ্গায় প্ররোচনা দেওয়া) এবং ১০৯ ধারা (অপরাধে সহায়তা)-র মতো গুরুতর ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগকারীর মতে, এই ধরনের মন্তব্য সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে সহায়তা করে।
রাজনৈতিক চাপানউতোর ও দিলীপ ঘোষের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দিলীপ ঘোষ বলেন, “২০২১ সালের নির্বাচনের পর অনেকে হিরো সাজতে চেয়েছিলেন। আমাদের কর্মীরা যখন আক্রান্ত হচ্ছিলেন, তখন সমবেদনা না জানিয়ে এই শিল্পীরা আক্রমণকারীদের বাহবা দিয়েছেন। এটা সাধারণ অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ।”
অন্যদিকে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এখনও পুলিশের মুখোমুখি হননি। জানা গিয়েছে, তিনি বর্তমানে আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করছেন। পুলিশ সূত্রে খবর, শীঘ্রই তাঁকে পুনরায় তলব করা হতে পারে। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় থানা থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে সরাসরি কোনও মন্তব্য না করলেও তাঁর বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
শিল্পীদের বাকস্বাধীনতা বনাম আইনি দায়বদ্ধতা
এই মামলাটি ভারতের বিনোদন জগতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় করা একটি মন্তব্য বা তাতে দেওয়া সমর্থন কীভাবে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আসতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া বার্তা যদি সরাসরি কোনও হিংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়, তবে তার আইনি পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
আইনজীবী জয়দীপ সেনের দাবি, পরমব্রতর পোস্টটি সরাসরি ১০৭ ধারার আওতায় উস্কানিমূলক হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাঁর মতে, অভিযুক্তদের প্রয়োজনে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত যাতে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়। অন্যদিকে, শিল্পীদের একাংশ মনে করছেন এটি প্রতিহিংসামূলক আচরণ হতে পারে।
আগামী দিনগুলোতে এই মামলার তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলের। পুলিশ স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের দেওয়া বয়ান যাচাই করে দেখবে এবং পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের হাজিরার ওপর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে। আদালতের হস্তক্ষেপে এই দুই তারকার আইনি রক্ষাকবচ মেলে কি না, এখন সেটাই দেখার।